বর্ণাশ্রমের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি:-
“বর্ণ” কথার মানে হল,— বৈশিষ্ট্যের অভিজাত সমাবেশ। আরেকটু সোজা করে বললে, - - সমগুণাবলীর গুচ্ছ। মানুষের মধ্যে নানান গুণের প্রকাশ। এসব গুণরাজির (বা বৈশিষ্ট্যগুলির) মধ্যে কিছু কিছু গুণ একপ্রকার মানুষের মধ্যে, কিছু কিছু গুণ আরেক ধরনের মানুষের মধ্যে প্রকটভাবে দেখতে (সহজ প্রকাশ) পাওয়া যায়। এই সদৃশগুণ-ওয়ালা মানুষগুলিকে যখন এক একটি গুচ্ছে আলাদা করা হয়, তখন তাদের - বলে একই বর্ণের অন্তর্ভূক্ত মানুষ। অনেকদিন আগে থেকেই আর্যচতুর্বর্ণে মানুষগুলিকে এরকমই চারটি গুণাবলীর গুচ্ছে বা বর্ণে ভাগ করা হয়েছে।
এইসব গুণগুলির স্বতঃপ্রকাশ ঘটে সংস্কারের মাধ্যমে। সংস্কার মানে, নিরন্তর আচরণ যা সম্যকভাবে পালনের মধ্যে দিয়ে গুণগুলি আমাদের আয়ত্তে আসে। জীবকোষে স্থায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বংশপরম্পরায় প্রবাহিত হতে থাকে। তখন তার আরেক নাম সহজাত সংস্কার (Instinct)। ঠাকুর বললেন, - “এরকম সদৃশ সহজাত সংস্কারের গুচ্ছই হল এক-একটি বর্ণ। তাই, বর্ণাশ্রম ব্যবস্থায় রয়েছে রকমারি বৈশিষ্ট্যের শ্রেণীবদ্ধ প্রকাশ। এতে বিভেদের কোন স্থান নেই।
”বিশেষ কিছু প্রোটিনের উপস্থিতি-অনুপস্থিতির উপর ভিত্তি করে যে চার রকম গ্রুপের রক্ত পাওয়া যায় সেগুলি হল 'O', ‘AB’, ‘A’, ‘B’ ।
‘O' নিজের রক্ত সবাইকে দিতে পারে। ‘AB’ নিতে পারে। আর ‘A’, ‘B' নিজেদের গ্রুপ ছাড়া আর কাউকে ('AB ছাড়া) দিতেও পারে না। প্রকৃতির অমোঘ এই সত্যকে ভেদাভেদ হিসেবে চালালে, মুশকিলটা আমাদেরই। বরঞ্চ, প্রকৃতির এই নিয়ম-সংবদ্ধতাগুলি খুঁজে নিয়ে তাকে আমাদের কাজে কিভাবে লাগানো যায়, — এর চেষ্টা করাই মনে হয় অনেক বেশি প্রার্থিত।
আর্যচতুর্বর্ণের চারটি বিভাগ হল, – বিপ্র, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র। পৃথিবীর বুকে আদিম প্রাণ হয়ত একটিই সৃষ্টি হয়েছিল। প্রকৃতির সাথে মানিয়ে নেওয়া আর উন্নত বিবর্তনের তাগিদে সে আজ বিভিন্ন জীবগোষ্ঠীতে বিভক্ত। নানান জীবগোষ্ঠীর মধ্যেও ঐ একই কারণে সৃষ্টি হয়েছে নানান প্রজাতি বা প্রকার। ল্যাংড়া-হিমসাগর-ফজলি কিংবা এক্সিমো-আরবীয়-আমেরিকান।
মানুষ যখনই সৃষ্টি হল, তার সাথে সাথেই বর্ণের স্ফুরণ হল। মানুষ যা হতে যেমন করে উদ্ভিন্ন হয়েছিল, তার ভিতরেই এটা সুপ্ত-ভাবে সঞ্জীবিত ছিল। তারপর বহু সহস্র বছরের কসরতের ভিতর দিয়ে আজকের এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই বৈচিত্র্য এবং বিভিন্নতার উদ্দেশ্য হচ্ছে পরস্পর পরস্পরকে উপভোগ করা। পরস্পরের প্রয়োজনকে পূরণ করা। সব যদি এক হয়ে যেত, বৈচিত্র্য বলে কিছু থাকত না। সবাই এক হয়ে থাকলে কে কাকে প্রেরণা দেবে? আমরা যত কিছু উপভোগ করি, তা অন্যের মাধ্যমে বা অন্যের সহায়তা ছাড়া পারি কি?
আর ছোট বা হেয় বলে যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে, তা আদৌ যুক্তিযুক্ত নয়। ছোট বা হেয় বলে বর্ণাশ্রমে কোন কথাই নেই। যে যে-বর্ণেরই অন্তর্গত হোক না কেন, প্রত্যেকেই প্রত্যেকের কাছ থেকে যথাবিহিত সম্মান পাওয়ার যোগ্য। স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে প্রত্যেকেই বড়। কেউ কারো ঘৃণার বা অবহেলার পাত্র নয়। প্রাচীন আর্যসমাজে পরস্পরের সাথে পরস্পরের একটা অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ছিল। স্বীয় বৃত্তি অনুযায়ী কাজ করে সবাই বড় হবার সুযোগ পেত সমাজের মধ্যে প্রত্যেকেরই নির্দ্দিষ্ট কাজ বা বৃত্তি ছিল। বিশেষতঃ পুত্র পিতার বৃত্তি বা ব্যবসার স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী। তখন একে অন্যের বৃত্তি হরণ করতে পারতেন না। বৃত্তিহরণ মহাপাপ বলে গণ্য হত। ফলে বহুপুরুষ ধরে একই কার্য বা বৃত্তি অবলম্বন করে চলার দরুন ঐ বিষয় নিয়ে একটা গবেষণার স্রোত সব সময়ই জেগে থাকত এবং মানুষগুলির মধ্যে দক্ষতার স্বাভাবিক স্ফুরণ হত। বংশপরম্পরাগতভাবে বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে উজীরপুরের (অধুনা বাংলাদেশ) কামাররা হাতের কায়দায় এমন সব বন্দুক তৈরি করতে পারতেন, যা আজকের যন্ত্রে তৈরি বন্দুকের সাথে পাল্লা দেওয়ার সাহস ধরে। ঢাকার (বাংলাদেশ) মসলিনের কথা কে না জানে? ছোটো একটা দেশলাই কৌটোর মধ্যে পুরো একখানা মলিন শাড়ি নাকি সহজে রাখা যেত! এখন সব গল্প মনে হয়! কিন্তু সেসব গল্প হলেও সত্যি। শ্রমিকেরা এসব সূক্ষ্ম উৎকর্ষ লাভ করত ঐ একই বৃত্তি বংশপরম্পরায় অবলম্বনের ভেতর দিয়ে, চর্চার মধ্য দিয়ে। নানান দিকে এরকম বেড়ে ওঠার সর্বোচ্চ গতি ব্রহ্মত্ব প্রাপ্তি পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত ছিল। ব্রহ্মত্ব বা ব্রাহ্মণত্ব লাভ করাই ছিল প্রত্যেক বর্ণের লক্ষ্য। এই ব্রহ্মত্ব কিন্তু একটা বিশেষ জ্ঞান যার পরিব্যাপ্তি বা প্রসারণ অনন্ত। প্রত্যেক বর্ণ থেকেই ব্রাহ্মণ হয়েছে এর ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। উল্লেখ্য-বিপ্র মানেই কিন্তু ব্রাহ্মণ নয়। শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন যে, ক্ষত্রিয়ের মধ্যে যদি কেউ একবার ব্রাহ্মণত্ব লাভ করতে পারেন এবং পাঁচ পুরুষ ধরে বংশপরম্পরায় তা অক্ষুণ্ণ থাকে, তখন সমাজে তাদের বিপ্র বলে আখ্যা দেওয়া হ'ত। আবার, বৈশ্যবর্ণের মধ্যে তা সাত পুরুষ ধরে অব্যাহত থাকলে সেই বংশ বিপ্রত্ব প্রাপ্ত হত। কারণ, ঐ কয়েক পুরুষ ধরে ব্রাহ্মণ্য-কৃষ্টির কর্ষণে বিপ্রবর্ণের গুণাবলী তাদের জীবকোষে গিয়ে স্থায়িত্ব লাভ করে সহজাত সংস্কার (Instinct)-এ পর্যবসিত হয়ে দাঁড়াত।
তাই, সমাজে একটা ক্রমাগতির রাস্তা সব সময় প্রশস্ত ছিল। সমস্ত বর্ণের প্রতিটি মানুষের বর্দ্ধনার দিকে গতি বরাবরই অব্যাহত থাকত। এই গতি অব্যাহত থাকার দরুন সমস্ত সমাজ-দেহটাই একটা উদ্বৰ্দ্ধনার দিকে সতত সঞ্চারমান ছিল।
আজ সমাজে বেকার সমস্যা দেখা দিয়েছে। তার মূল কারণই হল বিকৃত চলন এবং একের দ্বারা অন্যের বৃত্তিহরণ। যে কাজ ক্ষত্রিয়ের, তা হরণ করছে অন্য বর্ণ। যে কাজ বিপ্রের, তা করছে আরেক বর্ণের মানুষ। ফলে, বৈশিষ্ট্যানুগ বৃত্তি না পেয়ে অনেকেই কাজ করে আরাম পান না। এবং সেই কাজে তারা তেমন সহজাত দক্ষতার পরিচয়ও প্রায়ই দিতে পারেন না। যেমন, আমার শিক্ষকতা কাজ ভাল লাগে। তা আমার সহজ ও স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। আমার পূর্বপুরুষগণও তা করে যথেষ্ট দক্ষতা ও খ্যাতি লাভ করেছেন। এখন বিশেষ কারণে আমি চলে এলাম ব্যবসা করতে। ফলে হারালাম দুকূলই। কারণ, সহজাত সংস্কারের চর্চা বাদ দেওয়াতে সেই লাইনের দক্ষতা অর্জন করা থেকে বঞ্চিত হলাম এবং সমাজকেও বঞ্চিত করলাম অধ্যাপনার দিক থেকে। আবার ব্যবসা ক্ষেত্রেও অনভিজ্ঞতার দরুন উন্নতি সুদূরপরাহত হ'ল। এমন অনেক তালগোল এখন সমাজে পাকিয়ে গেছে। অবশ্য এটা হয়েছে একদিনের ফলে নয়। এটা বহু শতাব্দী ধরে আমাদের খেয়ালখুশী-মাফিক চলনার দরু নই হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, একজন কি বরাবর একই কাজ নিয়ে পড়ে থাকবেন? অন্য কাজ করার কি তিনি সুযোগ পাবেন না? শ্রেণীহীন সমাজের সার্থকতা বা সফলতা তবে কোথায়? শ্রেণীহীন সমাজের পরিকল্পনা কতখানি সফল তা জানি না। তবে ব্যক্তিবিশেষ যে এক কাজ নিয়েই বরাবর পড়ে থাকবে, অটুটভাবে চিরতরের জন্যে, এমন কোন কঠোর নীতিবিধি বর্ণাশ্রমে নাই। কিন্তু এটা খুবই সত্য যে, বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও জৈবীসংস্থিতি নিয়ে বিশেষ বিশেষ মানুষের উদ্ভব। এই উদ্ভবের মূলে রয়েছে compatible marriage (সদৃশ বিবাহ) এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সুপ্রজনন নীতিবিধি।
স্বার্থের খাতিরে বা বাইরের চাকচিক্য দেখে অন্যবৃত্তি গ্রহণ করার সুযোগ নিয়ে অপরের স্বার্থ বা অধিকারকে কি কেড়ে নেওয়া হয় না? তাতে হয়ত সাময়িক সুবিধা কিন্তু সমাজ তাদের বৈশিষ্ট্যানুপাতিক অবদান থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং মানুষ বিবৰ্দ্ধন থেকেও বঞ্চিত হবে। তাই প্রাচীন আর্যসমাজে সমাজ বিধান ছিল যে, কেউ কিছু করার বা জানার জন্যে যদি আগ্রহান্বিত হতেন, তবে সেই বিষয়ে তাঁকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হত, কিন্তু তার দ্বারা তাঁকে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ দেওয়া হত না। স্বীয় বৈশিষ্ট্যের উপর দাঁড়িয়ে বর্ণোচিত কর্মের দ্বারা জীবিকা অর্জন করে আমরা যদি পৃথক কোন বর্ণের কাজ শিখি, তবে তা দোষের নয়। কিন্তু যখনই কেউ জীবিকা নির্বাহের জন্যে অন্য বর্ণের কাজ গ্রহণ ক'রে অর্থ আহরণ করে তখনই সেই বর্ণের একটি লোকের জীবনযাত্রার পথও রুদ্ধ হয়ে যায়। এর সাথে সাথে একজন বেকারের জন্ম হতে সাহায্য ক’রে সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। এজন্যই বৃত্তিহরণকে মহাপাপ বলে গণ্য করা হয়।
ধন-বন্টনের কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়ে বৈশ্যদের কথা । আগেই বলেছি, সমাজের মধ্যে একটা গুচ্ছ ছিল যাদের বলা হত বৈশ্য । সমাজের ধনসম্পদ বলতে যা কিছু, তা প্রায় সবই এই বৈশ্যদের হাতেই ছিল। এঁরা বাণিজ্যার্থে বিভিন্ন দেশে ব্যবসা করে ধনসম্পদ আহরণ দ্বারা দেশকে পুষ্ট করতেন। কখনও পর্যাপ্ত অর্থ দানও করতেন বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে। বিপ্রদের এঁরা আবার অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু কালক্রমে বৃত্তির মোহে পড়ে, বিজাতীয় কৃষ্টির সংস্পর্শে এসে, আর্যকৃষ্টিকে অর্থাৎ আর্যজীবন বৰ্দ্ধনীচর্যাকে তাঁরা অবদলিত করেছিলেন। ঐ কৃষ্টি- বিচ্যুত চলন তাঁদের মধ্যে ক্রিয়াশীল ছিল। বঙ্গের ও ভারতের অধঃপতন ঐ কৃষ্টি বিচ্যুত চলনেরই ইঙ্গিত।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, জার্মানির যুদ্ধে পরাজয় ও দুর্দশার মূলেই বৈশ্যগণ। পাশ্চাত্য দেশেও যে আজ নানাবিধ বিভীষিকার ও ক্ষোভের উদ্ভব হচ্ছে, তার মূলেও এই বৈশ্যগণ বলে মনে হয়। মনু সংহিতাতে আছে—
“ বৈশ্য শূদ্রৌ প্রযত্নেন স্বানি কর্ম্মাণি কারয়েৎ। তৌর্হি চ্যুতৌ স্বকৰ্ম্মভ্যঃ ক্ষোভয়েতমিদং জগৎ।।”
অর্থাৎ “রাজা যত্নসহকারে বৈশ্য ও শূদ্রকে স্ব-স্ব কার্য করাইবেন, যেহেতু উভয়ে স্বধর্মচ্যুত ও স্বকার্যচ্যুত হইয়া মদমত্ততায় জগৎকে বিক্ষোভিত করে।”
বৈশ্যরা আর তেমনভাবে অর্থ দিয়ে সমাজকে পুষ্ট করতেন না বলে বিপ্রদেরও অযাচিত দান থেকে বঞ্চিত করলেন। বিপ্রদের কাছে অর্থ না থাকার দরুন তারা জীবিকার জন্যে নানান উপায় অবলম্বন করতে বাধ্য হলেন। যদিও আপদ্ধর্ম আপদকালীন অবস্থায় সাময়িক ধর্ম-পরিবর্তন হিসাবে শাস্ত্রের কিছু নির্দেশ ছিল। কিন্তু আপদ্ধর্মকে মানুষ যদি স্বধর্ম করে নেয় এবং তা যদি বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে, তাহলে সেটা পাতিত্যের কারণ হয়ে ওঠে। কিন্তু এই কর্মজনিত পাতিত্য মানুষের মৌলিক রক্তগত কৌলিন্য ও বীজগত সংস্কারকে বিপর্যস্ত করতে পারে না, তথাপি এই আপদকালীন কর্মজনিত পাতিত্যের দরুন বিপ্রদের এক বহুল অংশ স্বধর্ম থেকে চ্যুত হয়েছিল। এভাবে বৈশ্যদের পাতিত্যের দরুন বিপ্রদেরও পাতিত্য এলো। তার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য বর্ণেরও।
(শ্রীশ্রীঠাকুর কথিত 'নানা প্রসঙ্গে', ৪র্থ খণ্ড)।
বৈশ্যদের প্রধান কাজই ছিল ব্যবসা, বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প ইত্যাদির ভেতর দিয়ে বৃহৎ হতে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকের সেবা দিয়ে নিজের পরিবারের ন্যায় সবার পুষ্টিসাধন করা। তাদের জীবনে ত্যাগ ছিল যথেষ্ট। দানের খাতায় অঙ্কও ছিল সবচেয়ে বেশি। আর্থিক সম্পদ তাদের সব সময় সেবা করত। কিন্তু এই সম্পদের প্রতি আসক্তি যদি তাদের পেয়ে বসে অর্থাৎ তারা যদি কেবল অর্থ আহরণ করে বড়লোক হতে চায়, সেবাধর্ম ভুলে যায় তবে সমগ্র জাতির সর্বনাশ সাধন করতেও দেশব্যাপী বিশৃঙ্খলা আনতে পারে তারা সহজেই। তাই বৈশ্যগণ যাতে ইষ্টানুগ- পন্থায় সম্পদের আহরণ ও বন্টন করেন, তার ব্যবস্থা করতে হবে।
সমাজের মধ্যে আরেকটা গুচ্ছ ছিল, যাদের বলা হত ক্ষত্রিয়। যারা কায়স্থ, তারাই ক্ষত্রিয়। ক্ষত্রিয়গণ চিরদিনই আর্যসমাজকে ক্ষত হতে ত্রাণ করতেন। সমাজকে রক্ষা করা, শান্তিরক্ষা ও শান্তিস্থাপন করা ক্ষত্রিয়দের বৃত্তি ছিল। প্রজা-রক্ষণার্থে অস্ত্রের ধারণ ক্ষত্রিয়দের জীবিকা ছিল। “বেদোভ্যাসো ব্রাহ্মণস্য ক্ষত্রিয়স্য চ রক্ষণম্। শস্ত্রাস্ত্ৰভূত্ত্বং ক্ষত্রস্য বণিক্ পশুকৃষি-বিশঃ। আজীবনার্থং ধর্মাস্তু দানমধায়নং যজিঃ।।” (মনুসংহিতা ১০ অধ্যায়ের ৮০ এবং ৭৯) (ব্রাহ্মণদের বৃত্তি বেদাভ্যাস। ক্ষত্রিয়ের বৃত্তি রক্ষণ প্রজারক্ষণার্থে শস্ত্র ও অস্ত্রের ধারণ ক্ষত্রিয়ের কৃত্যর্থ জানিবে অর্থাৎ জীবিকা জানিবে। বাণিজ্য, পশুপালন ও কৃষি— এই তিনটি বৈশ্যের জীবনার্থ জানিবে এবং ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য উভয়েরই ধর্ম ইষ্টার্থে দান, অধ্যয়ন ও যজন।)
মানুষের বাঁচা বাড়ার যা-কিছু বাস্তব ক্ষত ও অন্তরায়, সেসবের অপসারণ করে মানুষকে রক্ষা করা ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য। দেশের শান্তিরক্ষা ও তত্ত্বাবধানের ভার তাদের হাতেই ন্যস্ত ছিল। তাই আর্য-আদর্শ ও কৃষ্টির পরিপোষণ উদ্দেশ্যে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়ে চাকুরী তারা অবলম্বনও করতে পারেন। কিন্তু চাকুরীর জন্যে আদর্শ ত্যাগ করা উচিত ?
সমাজের মধ্যে অনার্য যারা ছিল এবং যাঁরা আর্যাচার গ্রহণ করে শুচিতা লাভ করত, তাদেরই বলা হত শূদ্র। বিপ্র, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের প্রয়োজনীয় কাজের সাহায্য করাই তাদের কাজ ছিল এবং তার মধ্য দিয়েই তারা জীবিকা নির্বাহ করত। হাতে-কলমে কৃষি কাজ করা, কাঁচামাল উৎপন্ন করা, সমাজের সবাইকে সেবা দিয়ে পুষ্ট করে তোলা ও দেশকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে তারা সব সময়ই কর্মমুখর হয়ে থাকত।
আর, বিপ্রদের কাজই ছিল সার্বিক, সাত্ত্বিক কল্যাণ করা। সাত্ত্বিক কল্যাণ মানেই সত্তাসঙ্গত কল্যাণ। জীবনবৰ্দ্ধনীচর্যা যা প্রত্যেককে পরিপালন করে, তাই তাঁদের নিজেদের সাধনার বস্তু ছিল। শুধু তাই নয়, অপরাপর সাধারণ যারা আছেন, তাদেরও সে-পথে অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করে তোলার তাগিদও তাদের চরিত্রের মধ্যে স্বতঃই প্রবাহিত হত। তাই ব্রাহ্মণ ও বিপ্রদের এত সম্মান আমাদের দেশে। তাঁরা কখন ও পরের চাকরি করতেন না। নিজেদের জন্যে কারো কাছে বড় একটা কিছু যাঞ্চাও করতেন না। এঁরা ছিলেন আদর্শপ্রাণ, স্বাধীনচেতা ও নির্ভীক লোকযাজ্ঞিক। রাজ-রাজারা ও বৈশ্য, সবাই এঁদের শ্রদ্ধা করে চলতেন। আর এই বিপ্রদের মূলধনই ছিল সুনিষ্ঠ সেবাপ্রাণতা ও আদর্শনিষ্ঠ চরিত্র। ঐ চরিত্রই তাঁদের অযাচিত প্রাপ্তির অধীশ্বর করে রাখত। তাই সহজবোধেই কৃষ্টি ও সংস্কারের দিক দিয়ে বিপ্ররা অনেক বেশি বিবর্তিত। তারপর যথাক্রমে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র।
এই আর্য চতুর্বর্ণের মধ্যে পরস্পরের মিলনসূত্র ছিল অচ্ছেদ্য। জৈবী- সম্বন্ধ প্রত্যেক বর্ণের মধ্যে এমনতর বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিদ্যমান ছিল, যাতে সমগ্র সমাজদেহটাই একটি অটুট বিরাট পরিবার বলে মনে হত । আর বাস্তবিকপক্ষে সবাই এক পরিবারের লোকের মতই যেন বাস করতেন। অনুলোমক্রমে বর্ণান্তরের মধ্যে বিবাহাদি হত। তার ফলে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সাথে আত্মীয়তাসূত্রে গ্রথিত হত। সমাজের এই আত্মীয়তা ও বাঁধন দৃঢ় করার জন্যে অনুলোম-অসবর্ণ বিবাহের ব্যবস্থা ছিল। বিপ্র বর্ণানুক্রমে অন্যূন চারটি ভাষা, ক্ষত্রিয় তিনটি, বৈশ্য দু'টি এবং শুদ্র স্বীয় বর্ণের মধ্যে একটি ভাষাকেই সাধারণতঃ গ্রহণ করতে পারতেন।
বিপ্রসন্তানের সাথে বিপ্রকন্যার মিলনে যে সন্তান হবে, তিনি বিপ্র বলে আখ্যাত হবেন। বিপ্রের ঔরসে ক্ষত্রিয়া, বৈশ্যা ও শূদ্রাণীর গর্ভজাত সন্তানকে মূর্ধাবষিক্ত বিপ্র, অম্বষ্ঠ বিপ্র এবং পারশব বিপ্র বলে অভিহিত করা হয়। সেইরূপ ক্ষত্রিয়ের ঔরসে ক্ষত্রিয়া, বৈশ্যা ও শূদ্রাণী গর্ভজাত সন্তানকে ক্ষত্রিয়, মাহিষ্যক্ষত্রিয় ও উগ্রক্ষত্রিয় বলা হয়। বৈশ্যের ঔরসে বৈশ্যা ও শূদ্রাণী গর্ভজাত সন্তানকে বৈশ্য ও করণ বলে অভিহিত করা হয়। এইরকম বিবাহসূত্রে আর্যেরা পরস্পর পরস্পরের সাথে যুক্ত হতেন। মূল কথা হল—দেশের মধ্যে বেশি সুসন্তান সৃষ্টি করা। নোবেলজয়ী ডাঃ আলেক্সিস ক্যারেলও (Dr. Alexis Carrel) বলেছেন যে, জৈবিক আভিজাত্য বা মানদণ্ড (Biological aristocracy) দ্বারাই দেশের সভ্যতা ও কৃষ্টি অক্ষুণ্ণ থাকে এবং দেশের নানাবিধ সমস্যারও সমাধান হয়। আবার তিনি আতঙ্কে এও বলেছেন যে, “সর্বহারার দল (Proletariat) দেশের মধ্যে যত বেশি সৃষ্টি হয় বা জন্মলাভ করে, ততই লজ্জাকর ব্যাপার এবং দেশেরও তাতে সমূহ ক্ষতি। সভ্যতার চরম উদ্দেশ্যই হচ্ছে মানবিক ব্যক্তিত্বের উন্নয়ন সাধন।” তাই আমাদের এই ঋষিকৃত বর্ণাশ্রমের উদ্ভব। বিজ্ঞানসম্মত এই বর্ণাশ্রমের ফলেই ভারতীয় কৃষ্টি, সভ্যতা ইত্যাদি আজও মরেনি, নিঃশেষ হয়ে যায়নি চিরতরের জন্য।
পরিশেষে, আর একটি কথা বলা দরকার। প্রাচীন সমাজে অসবর্ণ বিবাহের প্রচলন ছিল। তাই বলে কিন্তু প্রতিলোম অসবর্ণ বিবাহ হত না। প্রতিলোম (Hypogamy) বিবাহে, অভিজাত বৈশিষ্ট্যগুচ্ছ সমন্বিত নারীর সহিত তদপেক্ষা অনভিজাত বৈশিষ্ট্য সমন্বিত পুরুষের মিলনে যে সন্তান হয়, তাহারাই প্রতিলোমজ। যেমন শূদ্র হতে বৈশ্যজাত ‘আয়োগব’, ক্ষত্ৰিয়াজাত ‘ক্ষত্তা', এবং ব্রাহ্মণীর গর্ভজাত সন্তান 'চণ্ডাল' নামে আখ্যায়িত।
"*The establisment of a hereditary biological aristocracy through voluntary eugenics would be an
important step towards the solution of our present problem. A crumbling civilization is capable of discerning the causes of its decay. The devalopment of the proletariat will be the everlasting shame of the industrial civilization. The development of the human personality is the ultimate purpose of civilization."
-Dr. Alexis Carrel Nobel Laureate
মেয়েদের স্বাভাবিক রকমই যেন শ্রেয়ের আশ্রয়ে যাওয়া। বিশেষ কোন কারণের চাপে যদি সে হীন পুরুষকে স্বামী হিসেবে বরণও করে, তার ভেতরের সত্তা কিন্তু তা মানতে চায় না। অন্তর্জগতে তুমুল আলোড়ন ওঠে। জীবজন্তুর বেলাতেও 'ক্রসিং'- এর সময় পুরুষ, স্ত্রীর চেয়ে নিকৃষ্ট (কম সু-বিবর্তিত) হলে প্রজন্ম নিকৃষ্ট স্তরের হয়। এর উল্টো দিকটা কিন্তু সতত শুভ । তেজীয়ান কুকুরের জন্ম দিতে হলে আমরা কিন্তু তেজী অ্যালশেসিয়ানকেই পুরুষ হিসেবে ব্যবহার করি। উদ্ভিদ-জগতেও তাই। উৎকৃষ্ট স্ত্রী-ফুলের সাথে নিকৃষ্ট পরাগরেণুর সংযোগে গাছের ফল খারাপ হয়। তাই ভালো ফলের জাত ঠিক রাখার জন্য ঐ জাতীয় ফলের নিকৃষ্ট ধরনের ফল প্রসবকারী গাছগুলিকে আশপাশ থেকে উঠিয়ে দেওয়া হয় যাতে সেখানকার নিকৃষ্ট পরাগরেণুর সংযোগে উক্ত গাছের ফল খারাপ না হয়। ‘প্রজনন প্রসঙ্গে' প্রবন্ধে আরেকটু সবিস্তারে আলোচনা করার ইচ্ছা রইলো।
আসলে, বর্ণাশ্রম বলি আর যাই-ই বলি না কেন,— এর উদ্দেশ্য তো আমাদের ভালোর জন্যে। বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এখন অনেক জায়গাতেই বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ের ব্লাড গ্রুপ 'ম্যাচিং' করানো হয়। ‘জীন-ম্যাপিং'— এর কাজ যেভাবে চলছে, ভবিষ্যতে হয়ত পাত্র-পাত্রীর জীন-ম্যাপ দেখেই ঠিক হবে তাদের বিয়ে পরবর্তী প্রজন্মে শুভদ ছাপ ফেলবে কিনা। এ সবই বর্ণাশ্রমের আধুনিকীকরণ। উন্মীলিত প্রজ্ঞা-চক্ষু নিয়ে মনটাকে খুলে রাখতে হবে,— কোন্টা গ্রহণ করব, কোন্টাই-বা করব না ।
#শ্রীশ্রীঠাকুরের_আলোকে_বিজ্ঞান
#thakurear_Aloke_bighean
তৃতীয় সংস্করণ
মণিলাল চক্রবর্তী
https://www.amritokatha.in/



10