Topic & Pag no 👇
- *পুরাতন বস্তু বা ব্যক্তিতে প্রীতি-৯৫
- *বিশিষ্টতার বোধ মানে কী-৯৬
- *সবই সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ বিশেষ বৈশিষ্ট্যে-৯৬
- *বর্ণাশ্রম না-মানা কুসংস্কারেরই লক্ষণ-৯৭
- *বর্ণাশ্রমের গুরুত্ব- ৯৭
- *বৈশিষ্ট্য-অনুযায়ী 'পরিপোষণ চাই সমাজে-৯৭
- *দেশের দুরবস্থার চিত্র-৯৮
- *পাশ্চাত্য শিক্ষার ভাল দিক-৯৮
- *কাজের নেশা-৯৯
- *ইষ্টে টান হওয়ার ফল-১০০
- *ভালবাসার স্বরূপ-১০০
- *কর্মীদের প্রতি-১০১
- *নিজ দোষ স্বীকার করার কৌশল-১০১
- *বর্ণান্তরের হাতে অন্নগ্রহণ সম্বন্ধে-১০১
- *যাজনে চরিত্রের স্থান-১০১
- *শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রত্যাশা-১০১
- *বড়র চলন যেন শ্রদ্ধাকর্ষী হয়-১০২
- *শ্রদ্ধা-১০২
- *সত্তা ও প্রবৃত্তি-১০২
#আলোচনা_প্রসঙ্গে_তৃতয়ী_খণ্ড(95-102)
৩ রা মাঘ , শুক্রবার , ১৩৪৮ ( ইং ১৭।১।৪২ )
শ্রীশ্রীঠাকুর প্রাতে নিভৃত - নিবাসে এসে বসেছেন । তিনি একখানা বই দেখবার জন্য চশমা চাইলেন , কালিদাসীমা চশমাটা এনে দিলেন । এনে দিতে দিতে বললেন — আজকাল কত ভাল - ভাল ফ্রেমের চশমা বেরিয়েছে , চশমাটা বদলে নিলে হয় ।
শ্রীশ্রীঠাকুর - চশমাটা সেই কবে দিয়েছিলেন কলকাতায় ডাক্তার কার্ত্তিক বােস । অনেকদিন ধরে ব্যবহার করছি , ছাড়তে ইচ্ছে করে না , তা ছাড়া কার্ত্তিক বোসের একটা স্মৃতি ।
কালিদাসীমা — আপনি পুরােন কিছুই ছাড়তে চান না ।
শ্রীশ্রীঠাকুর - যার সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয় , তাকে আমার ছাড়তে ইচ্ছে করে না । একদিনও যদি আমি কারও service ( সেবা ) পাই , তাকে ভুলতে পারি না । মানুষ সম্বন্ধে যেমন , জিনিস সম্বন্ধেও তেমন । তাই , কারও ব্যবহারের কোন জিনিস যদি কেউ আমাকে ভালবেসে দেয় , তা'ও গ্রহণ করতে আমার মন কুণ্ঠিত হয়ে ওঠে । ধর , আমি কোন কাজের জন্য টাকা চেয়েছি , কোন মা যদি তার গায়ের গহনা খুলে দিতে চায় , আমার কিন্তু তা ' নিতে মন চায় না , যদিও তার এই উৎসর্গ - প্রবৃত্তি প্রশংসনীয় । নিনর বস্তুগুলিরও একটা চেতন সত্তা আছে , তারাও মানুষের স্নেহমমতার তাপ বুঝতে পারে , এমনি করে তাদেরও মানুষের সঙ্গে একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে , তারাও তাদের প্রিয় মানুষটির সঙ্গ খোঁজে , তার সঙ্গে সম্পর্ক চ্যুত হ'লে বেদনা বােধ করে । এগুলি বাড়ান কথা নয় , একটু নজর দিলে এ - সব বােধ করা যায় । আদৎ কথা কী জান ? দুনিয়ায় অচেতন নয় কিছুই । ইট , কাঠ , মাটি , পাথর সবই সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ ।
প্রফুল্ল ( বিস্ময়ের সঙ্গে ) —সবই সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ ?
শ্রীশ্রীঠাকুর — হ্যাঁ , হ্যাঁ , সবই সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ , তবে প্রত্যেকটি রূপেরই বৈশিষ্ট্য আছে । সৎ , চিৎ ও আনন্দের প্রকাশ এক - একটার মধ্যে এক - এক রকমে , এক - এক পর্যায়ে । এইরকম ও পৰ্য্যায়গুলিকে জানা হলাে বিজ্ঞান । বিশ্ব দুনিয়াময় অণুপরমাণুর লীলা চলেছে । বিভিন্ন সত্তায় বিভিন্ন সমাবেশ , বিভিন্ন সমবায় । সমাবেশ ও সমবায়ের বিভিন্নতা অনুযায়ী হয় গুণাগুণ ও কার্যকারিতার বিভিন্নতা । এই অনুযায়ী আবার হয় বিশিষ্টতার পার্থক্য । সব সচ্চিদানন্দবিগ্রহ বলছ অথচ সেই সচ্চিদানন্দ কোথায় কোন বিশিষ্টতায় প্রকট তা যদি না জান , তাহলে বুঝতে হবে , তুমি মুখস্থ কথা বলছ , কোন বােধ নেই তােমার , অন্ধ তুমি , নিরেট তুমি । তােমার ঐ তত্ত্বকথা কারও কোন কাজে লাগবে না । জ্ঞান বা জানার জন্য চাই কাজ করা । সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে গেলে আবার চাই বিশিষ্টতার বােধ । তা'ছাড়া কাজ হবে না । তাই জ্ঞান ও কর্ম পরষ্পরসাপেক্ষ কাজ করতে হলে জানা চাই , কেমন করে কী করতে হবে , আবার করতে - করতে জানা যায় , কী করলে কী হয় ।
প্রফুল্ল সুষ্ঠভাবে কাজ করতে হলে বিশিষ্টতার বােধ দরকার — তার মানে কী ? কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না।
শ্রীশ্রীঠাকুর — ধর , তুমি একটা গরু , পুষবে । গরু , পুষতে গেলে তোমার জানা চাই — গরু , কী ধরণের জন্তু , তার আহার ও বাসস্থান কিরকম হওয়া প্রয়ােজন । তা না জেনে তুমি লুচি খেতে ভালবাস ব'লে যদি গরুকে রোজ লুচি তৈরী করে খেতে দাও , তাহ'লে তা ' কিন্তু গরুর রুচবে না । অত ভাল খাবার দিয়েও তুমি তাকে বাঁচাতে পারবে না । আবার ধর , তুমি বদ্ধ ঘরে থাকতে ভালবাস , গরকে বদ্ধ ঘরে দরজা - জানালা বন্ধ করে রেখে দিলে , তাতেও কিন্তু গরুর হাঁপিয়ে মরার উপক্রম হবে । আবার না হয় ধর , তুমি জান , গরু , ঘাস - পাতা , তরকারীর খোসা , ভাতের ফেন এই সব খায় , কিন্তু কী পরিমাণ খাদ্য গরুর দৈনিক প্রয়ােজন তা না জানার দরুন তুমি যদি নিজের খাদ্যের বরাদ্দমতো গরুর খাদ্যের ব্যবস্থা কর , তা'তেও কিন্তু গরু , না খেয়ে মরতে বসবে । আবার , তোমার গরুটা কোন জাতের তা'ও জানা চাই । ভাগলপুরী গাই যদি হয় , তার খাদ্য - খানা দেশী গাইয়ের মতাে হবে না । তাই দেখ , কাজ করতে গেলে বিশিষ্টতার জ্ঞান দরকার হয় কিনা । সব ব্যাপারেই এমনতর । একটা তরকারির ক্ষেত করতে হলেও বিশিষ্টতার জ্ঞান চাই — আলু , মুলাে , কচু , কলা , কপি — সবই সচ্চিদানন্দ - বিগ্রহ ভেবে যদি তুমি একইভাবে ফলাতে চাও , তাতে কিন্তু হবে না । যার যেমনতর nurture ( পােষণ ) দরকার , তাকে তেমনতর nurture ( পােষণ ) দিতে হবে , তবে ফল পাবে । যাকে তোমরা অচেতন পদার্থ মনে কর , সেখানেও ঐ কথা । তােমার কাপড়টাকে সোডায় সিদ্ধ কর বলে শালটাকে সােডায় সিদ্ধ করতে পার না , তাহলে শাল আর শাল থাকবে না । দুনিয়ায় বিশিষ্টতা নিয়েই মানুষের কারবার । প্রত্যেক যা - কিছু , ও যে - কেউই বিশিষ্ট , তার পালন , পােষণ ও বন্ধনও করতে হবে বিশিষ্ট রকমে , তবেই তার বৈশিষ্ট্য বজায় থাকবে । বৈশিষ্ট্য ভেঙ্গে ফেললে তার সত্তায় অপঘাত হানা হবে , তার যা ' দেয় তা আর পাবে না । মহা ক্ষতি হয়ে যাবে । আজকাল অনেকেই বামুন অর্থাৎ বিপ্র হতে চায় । আমি বলি — তা'তে তাের লাভ কী ? ক্ষত্রিয় যদি প্রকৃত ক্ষত্রিয় হয় , বৈশ্য যদি প্রকৃত বৈশ্য হয় , শুদ্র যদি প্রকৃত শূদ্র হয় , তার ঠেলতেই তো দেশশদ্ধ নিজেরা বড় হয়ে যেতে পারে । তা না ! নিজেদের বিপ্র বলে জাহির করতে চায় । এতে কোন তরফ থেকে সুবিধা নেই । বিপ্র যতই মহান হােক , শুধু , বিপ্র দিয়ে সমাজ চলবে না । সমাজের আছে বিচিত্র প্রয়োজন , শুধু , বিপ্রকে দিয়ে সব প্রয়োজন সিদ্ধ হতে পারে না । তাই , প্রত্যেকটি বর্ণের অস্তিত্ব চাই , উন্নতি চাই । সব বর্ণের সমবায়ী প্রচেষ্টার ভিতর দিয়েই সমাজ বড় হ'তে পারে । তাছাড়া বৈশিষ্ট্যকে বর্জন ক'রে , ঢং করে অন্য কিছু , সাজার বুদ্ধি ভাল না । অনেক বিপ্র আছে , মানুষের কাছে প্রিয় হবার জন্য অসংস্কৃত ও অসদাচারী যে - কোন লােকের বাড়ী গিয়ে পাতা পেতে বসতে দ্বিধা করে না । লােকের কাছে বড়ই করে বলে আমি Libcral ( উদার বুদ্ধিসম্পন্ন) আমার কাছে ওসব Superstition কুসংস্কার নেই। আমার কীন্তু শুনে মনে হয় এরা অত্যন্ত narrow ও (সঙ্কীর্ণ ) ও superstitious. Narrow(সংকীর্ণ) এইজন্য বলছি যে , ব্যক্তিগত বাহবার খাতিরে , আত্মপ্রতিষ্ঠার সঙ্কীর্ণ স্বার্থে সে তার পিতৃপুরুষের সদাচারের ধারাকে পদদলিত কুরতে কুন্ঠিত হয় না , আর superstitious ( কুসংস্কারসম্পন্ন ) এইজন্য বলছি যে , তার ধারণা যে বার্ণাশ্রম , যা’ কিনা জাতির উন্নতির মেরুদণ্ড , তাই ভেঙ্গে দিতে পারলেই জাতির একতা ও কল্যাণ হবে । এর চাইতে মূঢ় কুসংস্কার আর কী থাকতে পারে? Free tlinking- এর ( সাধীন - চিন্তার ) নাম দিয়ে , হীনম্মন্যতা - প্রসূত বৈশিষ্ট্যবর্জ্জনী উচ্ছৃঙ্খল মতবাদের প্রশ্রয় দিয়ে আমাদের তথাকথিত শিক্ষিতেরা যতখানি কুসংস্কারাপন্ন হচ্ছে , আমাদের দেশের নিরক্ষরেরা কোনদিন ততখানি কুসংস্কারাপন্ন হয়নি । তাদের শ্রদ্ধা ছিল , ভক্তি ছিল , অস্থা ছিল , নিয়ম ছিল , আচার ছিল নিষ্ঠা ছিল। কোন কোন জায়গায় যুক্তি - বিচার ছিল না , মাত্রাহীন বাড়াবাড়ি ছিল , তাতে যে ক্ষতি হতাে , তার একটা সীমা আছে , সংশােধনও আছে । কিন্তু অজানা যুক্তিবিচারের নামে হীনম্মন্যতা ও প্রবৃত্তিপরায়ণতাই যেখানে প্রভু ও গরুর আসনে আসীন , যেমনতর লোকের লেখাই হােক , ইংরেজী ভাষায় quotation ( উদ্ধৃতি ) হ'লেই তা যেখানে শাস্ত্রবাক্য , তার দ্বারা যে ক্ষতি হয় ও হ'চ্ছে । তার কোন সীমা - সংখ্যা নেই , জাহান্নমের আগে তার পরিসমাপ্তি ও সংশােধন হ'তে পারে কিনা জানি না । সেকালে অনিয়ন্ত্রিত লোকের লেখাকে ও মতবাদকে মানুষ কোন মূল্য দিত না , তা ' যতই জোরালাে হোক , যতই চিত্তাকর্ষক হোক । তখন ঋষিরাই ছিলেন । সমাজের নিয়ন্তা ; মানুষের প্রবৃত্তি যা'তে উস্কানি না পায় , তার সদ্বৃত্তি যাতে স্ফুরিত হয় , সেই ছিল তাঁদের বুদ্ধি । শিক্ষা - দীক্ষা , বিয়ে - থাওয়া , সমাজব্যবস্থা ইত্যাদির কাঠামো ছিল তেমনতর । তাঁরা মানুষের প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করেননি , বা তাকে নিরন্ধও করতে চাননি , কিন্তু চেয়েছেন , কী ক'রে তাকে সুনিয়ন্ত্রিত ক'রে সফলপ্রসূ করে তোলা যায় , ব্যষ্টিসহ সমষ্টির বাঁচা - বাড়ার উপযােগী ক'রে তোলা যায় , এই ছিল তাঁদের লক্ষ্য । ঋষির অনুশাসন যতদিন বলবৎ ছিল সমাজে , ততদিন সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতাে কম । কিন্তু আজ পাশ্চাত্ত্য শিক্ষার সম্মুখীন হ'য়ে সবই যেন তালগোল পাকিয়ে গেছে । পাশ্চাত্য শিক্ষাকে আমি দোষণীয় বলি না । দোষণীয় বলি শিক্ষার বদহজমকে , আত্ম - অবজ্ঞাকে । মানুষ যদি স্বকীয় কৃষ্টি , ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্যকে আচ্ছাসে পাকড়ে ধরে আত্মস্থ না থাকে , তাহ'লেই এমনতর বিপর্য্যয় দেখা দেয় । সে তখন বাইরের জিনিসটা Assimilate ( আত্মীকৃত ) ক'রে আত্মপুষ্টি সংগ্রহ করতে পারে না , বরং তার খোরাক হয়ে পড়ে । আমাদের হয়েছে সেই তাবস্থা । তাই পাশ্চাত্য শিক্ষার ভাল দিকটা আমরা গ্রহণ করতে পারিনি । ওদের efliciency ( দক্ষতা ) , inquisitiveness ( অনুসন্ধিৎসা ) , inclustrious habits ( শ্রমপরায়ণতার অভ্যাস ) , practicality ( বাস্তবতাজ্ঞান ) , ( discrimination ( সঙ্কল্প ) ,will ( ইচ্ছাশক্তি ) , scientific trend ( বৈজ্ঞানিক ধারা ) , sense of national prestige ( জাতীয় মৰ্য্যদাবােধ ) আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়নি । আমরা না জলের , না স্থলের , না উভচর , . আমরা যেন ত্রিশঙ্কুর মতো শুন্যে ঝুলছি । আমাদের অনেকের পায়ের তলার মাটি গেছে স'রে , তাই আমাদের নিজস্ব যা তা ' ছাড়া চমকপ্রদ নতুন কিছু পেলেই আমরা হ্যাংলার মতাে কাণ্ড করতে থাকি । লজ্জায় , ঘৃণায় , আপসোসে আমার বুকখানার মধ্যে কেমন যেন করত থাকে । আবার মজা এমন , সঙ্গতিহীন কতকগুলি বাজে কপচানি মাথায় পুরে তারা নিজেদে মনে করে খুব শিক্ষিত । অহকারে ধরাকে সরা জ্ঞান করে । অথচ পরের চাকর না ব'নে স্বাধীনভাবে পেটের ভাত জোগাড়ের মুরােদ নেই । ফলকথা , শ্রদ্ধা না থাকলে মানুষ অন্তসারশূন্য হয়ে পড়ে । মানুষের শ্রদ্ধার ভাণ্ডার শুন্য করে দিয়ে , হৃদয়কে শুকিয়ে তুলে , মগজ ও যুক্তি - বুদ্ধিকে যতই পুষ্ট করা যাক না কেন , তাতে কল্যাণ নেই মানুষের । আমার সােনার দেশ শ্মশান ক'রে ফেললাে পাঁচ ভূতে মিশে । যে - দেশে ঘরে - ঘরে দেবতা জন্মাতাে , সে - দেশে বিশ গাঁও খুজে আজ একটা মানুষের মতাে মানুষ পাওয়া যায় না । অথচ জানি , ভােল ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন কিছু নয় , মন করলেই হয় ।
শ্রীশ্রীঠাকুরের কথাগুলি শাণিত তীব্রতা নিয়ে সবার অন্তরে বিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে । জালের ঘরের পরতে - পরতে অনুপ্রবিষ্ট হ'য়ে আছে তার অনুরণন । যদি কেউ সেখানে গিয়ে মনের একতানতা নিয়ে ধ্যানতন্ময় হয়ে পড়ে , সে টের পাবে , কত প্রেরণামন্ত্র লীন হ'য়ে আছে ঐ পূণ্য - প্রকোষ্ঠের প্রাণবেদীতে ।
সবাই স্তম্ভিতের মতাে নির্বাক হয়ে আছেন । মন স্থির , নিঃশ্বাসের গতি স্তিমিত , অবিন্যস্ত ও বিক্ষিপ্ত চেতনা একায়িত ও কেন্দ্রীভূত হ'য়ে তার আরামের ভূমিতে অধিষ্ঠিত ।
শ্রীশ্রীঠাকুর আনমনাভাবে চেয়ে আছেন বাইরের দিকে । হঠাৎ প্যারীদাকে জিজ্ঞাসা করলেন কাজলার সর্দি কেমন ?
প্যারীদা - কম ।
শ্রীশ্রীঠাকুর - ওর মাকেও একটু ওষুধ খাইয়ে দিস , তার আবার সর্দি না করে ।
প্যারীদা - আচ্ছা ।
শ্রীশ্রীঠাকুর - এখন ক'টা বাজে ?
হরিপদদা - সাড়ে আটটা ।
শ্রীশ্রীঠাকুর — অন্যদিন কেষ্টদা আসে , আজ তাে আসলাে না ।
প্রফুল্ল — ডাকব ?
শ্রীশ্রীঠাকুর - না , ডাকবার দরকার নেই । হয়তাে কাজকাম করতিছে ।........
এতগুলি মানুষকে nurture ( পােষণ ) দেওয়া , mould ( গঠন ) করা তাে কম কথা নয় । কেষ্টদার কাছে সবসময় এক দঙ্গল লােক থাকেই । যখন যারা যায় , তাদের একেবারে যাজনে মাৎ ক'রে রাখে । মানুষটার নেশাই এই । ঐরকম নেশাপাগল লােক লাগে । গোপালেরও খুব নেশা ছিল । গােপাল যেয়ে কেষ্টদার তার দোসর নেই । তাের ও বীরেনের science ( বিজ্ঞান ) পড়া থাকলি ভাল হতো । Science ( বিজ্ঞান ) পড়লে concrete ( বাস্তব ) এর দিকে নজর যায় বেশী ক'রে ।
প্রফুল্ল কতসময় কতরকম কাজের কথা আপনি কন , তাই মনে হয় , আপনার কাজ করতে গেলে সবজান্তা হওয়া দরকার , নচেৎ তার কাজ করা সম্ভব নয় ।
শ্রীঠাকুর সবজান্তা হয়ে কেউ কাওে নামে না । কাজ করতে করতে
সবজান্তা না হলেও বহুজান্তা হয়ে ওঠে মানুষ । সেইজন্য মানুষকে গােড়ায় একজান্তা হতে হয় , তখন সেই একের খাতিরে , তাঁর পােষণপরণের ধান্ধায় সে সব - জানার পথে এগিয়ে যায় । জ্ঞানবিদ্যের কচকচি যা ’ কও , ও - সব কিছুই কিছু না । মূল বস্তু হ'লাে তা'তে টান , নাংলা টান , এর মধ্যে কোন কারচুপি থাকবে না , কোন মতলব থাকবে না । ইষ্টকে সুখী করব , তাঁকে শান্তি দেব , তাঁর সন্তোষ যাতে হয় , তৃপ্তি যাতে হয় তাই করব আমার সারা জীবন দিয়ে , দুনিয়াটা দিয়ে । আত্মনিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি কথা শুনতে কত বিরাট ব্যাপার মনে হয় , কিন্তু মানুষ ভালবাসার দায়ে ছাড়তে না পারে , করতে না পারে , ধরতে না পারে এমন কিছু নেই । লহমায় মানুষের রূপ বদলে যায় ,চন্ডাশোক প্রিয়দর্শন হয় , রত্নাকর হয় বাল্মীকি । হ্যাঁ , চেহারাই বদলে যায় - রুক্ষ , ক্ষুব্ধ , বিরক্ত চোখমুখ কোমল , কমনীয় হয়ে ওঠে , দেখলেই ভালবাসতে ইচ্ছা যায় । বাইরে গিয়ে যাজন যে করবে , এই ভালবাসার চেহারা নিয়ে গিয়ে দাঁড়াও , দেখবে অর্দ্ধেক ফর্সা । আমাদের মন যখন যে ভাবভূমিতে থাকে , চেহারার মধ্য দিয়ে তার একটা aura ( জ্যোতিঃ ) বেরােয় , অন্যের কাছে গেলে পরস্পরের aura ( জ্যোতিঃ ) -র মধ্যে interaction ( পারস্পরিক ক্রিয়া ) হয় । প্রবৃত্তি মুখী মানুষের aura ( জ্যোতিঃ ) অন্যকেও প্রবৃত্তির দিকে টানে । তাই তোমাদের ইন্টপ্রাণতার aura ( জ্যোতিঃ ) যেন এতখানি শক্তিমান হয় , গাঢ় হয় , যার কাছে লাখ প্রবৃত্তি - পরায়ণতা নিষ্প্রভ হয়ে যায় , ফিকে হয়ে যায় । সেইজন্য যাজন করতে গেলে যজন খুব ভালভাবে করা লাগে , তা'ছাড়া একঘণ্টা যজন করলাম , একঘণ্টা যাজন করলাম , পাঁচ মিনিট ইষ্টভৃতি করলাম , আর বাদবাকী সময় আমার চিন্তা , চলা - বলায় ইষ্টের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই , এতে কিন্তু নোঙর ফেলে দাঁড় টানার মতো হবে , চরিত্র শোধরাবে না । Wholetime ( সর্বক্ষণ ) ঠাকুরের মানুষ হ'য়ে চলা লাগবে , সে খেতে , শুতে , বসতে , চলত , ফিরতে । অর্থোপার্জন - কর্মে রত থাকি যখন , তখন দেখতে হবে ধর্ম্মোপার্জ্জন কতখানি হচ্ছে তার ভিতর দিয়ে , স্ত্রী - সম্ভোগে রত থাকি যখন , তখন দেখতে হবে ইট - সম্ভোগ অথাৎ মঙ্গল - সম্ভোগ কতখানি হচ্ছে তার ভিতর - দিয়ে । ফলকথা , তামার জীবনের যাবতীয় যা - কিছু , অবিচ্ছিন্নভাবে ইষ্টার্থে পরিচালিত হ'চ্ছে কিনা তার উপর খবরদারী করতে হবে সর্বক্ষণ । এমনতর একমুখী হয়ে তীবনযাপনের ফলে চরিত্রের মধ্যে আসে integration ( সংহতি ) , তার ফলে গজিয়ে ওঠে ব্যক্তিত্ব , সেই ব্যক্তিত্ব প্রভাবিত করতে পারে অন্যকে । নইলে , যুক্তি - বিচার দিয়ে মানুষকে তুমি কতটুকু বােঝাবে ? প্রত্যেক জিনিসের for- এ ( অনুকূলে ) যেমন যুক্তি আছে , against- এও ( প্রতিকুলেও ) তেমনি যুক্তি আছে । গোড়ার কথা হলাে তার শ্রদ্ধাকে আকর্ষণ করা , অন্তরকে আকর্ষণ করা , আর চরিত্র না থাকলে , ব্যক্তিত্ব না থাকলে তা পারবে না । কথায় বাজীমাৎ করার জন্য হাজারাে জায়গা থেকে হাজারাে লােক বেরিয়ে পড়েছে । আচরণহীন উপদেশ শুনে - শুনে মানুষের ঘেন্না ধরে গেছে । লােকে সেয়ানা হয়ে গেছে , ফাঁকিজুকির কারবার বেশীদিন টেকে না বাপু ! তাই কইঃ তোমরা যেমন সাচ্চা মাল , সাচ্চা খবর নিয়ে মানুষের দুয়ােরে যাচ্ছ , তােমাদের চরিত্রটিকেও তেমনি সাচ্চা ক'রে তােল । তােমাদের মধ্যে মেকী জিনিস থাকলে মানুষ মনে করবে , তোমরা যে জিনিসের বার্ত্তা বয়ে নিয়ে যাচ্ছ তাও মেকী । দেখাে , নিজের চলার দোযে মানুষকে পরমপিতা হ'তে বঞ্চিত ক'রাে না । ভাল করতে এসে মন্দ ক'রাে না , মানুষের ক্ষতি করাে না । বরং নিজের মধ্যে কোন unadjusted , glaring ( অনিয়ন্ত্রিত , অতিদূষ্য ) গলদ যদি থাকে , যার দ্বারা মানুষ আচমকা shocked ( আহত ) হ'তে পারে , তা ' প্রয়ােজনমতাে আগে থাকতে খােলাখুলি জানিয়ে রাখা ভাল । এইভাবে বলতে হয় -- দেখেন দাদা ! কথা আমরা অনেক শিখেছি , কিন্তু ঠাকুর যেমন বলেন তেমনভাবে চলতে শিখিনি । আপনি হয়তাে আমার মুখে ঠাকুরের কথা শুনে কত খুশি হয়েছেন । ভেবেছেন , আমার চলন চরিত্রও ঠাকুরময় , কিন্তু প্রকৃত - প্রস্তাবে তা নয় । ছেলেবেলা থেকে আমি বড় রাগী , রেগে গেলে আমার জ্ঞান থাকে না , আগের থেকে রাগ অনেকটা কমেছে , কিন্তু এখনও মাঝে - মাঝে বেসামাল হয়ে পড়ি । আমার জন্য পরমপিতার কাছে রোজ একটু প্রার্থনা করবেন — যাতে আমি এই দোষটা ত্যাগ করতে পারি । আর , আপনার সঙ্গে চলতে - ফিরতে রাগের বশে বেফাঁস যদি কখনও কিছু বলে ফেলি বা করে ফেলি , তা'তে আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না কিন্তু । রাগের মাথায় আমার কিছু ঠিক থাকে না , পরে অনুতাপে জ্বলে মরি । মানুষ যদি শুভার্থী ও অকপট হয় , দোষ - ত্রুটি সত্ত্বেও অন্যের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করতে পারে সে । নইলে সাধুতা নেই সাধুতার ভড়ং আছে , আর সাধুর প্রাপ্য শ্রদ্ধা আদায় করার কারসাজি আছে , এতে মানুষ বিরক্ত হয়ে যায় ।........... কথায় কয় - ক্ষণমিহ সজ্জনসঙ্গতিরেকা ভবতি ভবার্ণব - তরণে নৌকা ।’ তোমরা এমন সাধু হও , এমন সজ্জন হও , যাদের সঙ্গে মুহূর্ত্তমাত্র সঙ্গ করেও মানুষ ত'রে যেতে পারে সেটা শুধু ; মৃত্যুর পর পরকালের ব্যাপারে নয় , ইহকালে - ভবলোকে যা'তে প্রবৃত্তিবশ হ'য়ে তাকে নাকানি - চুবানি না খেতে হয় , সে যা'তে সদ্ভাবে জীবনটাকে উপভোগ করতে পারে আর দশজনের সঙ্গে , তা করে দেওয়া চাই । তাই বুঝে দেখ - তোমাদের কতখানি সাধনা দরকার ।
প্রফুল্ল ঠাকুর ! আপনি যে বিপ্রের যেখানে - সেখানে খাওয়ার বিষয় অতাে নিন্দা করলেন , কিন্তু অন্য বর্ণের অন্ন খেলেই কি বিপ্রের জাত যায় ?
শ্রীশ্রীঠাকুর আমি তা বলব কেন ? আমি বলেছি , অসংস্কৃত ও অসদাচারী যারা , তাদের হাতে খাওয়া ঠিক নয় । দ্বিজ-সংস্কারী যারা , সদাচারী যারা , তাদের পরস্পরের অন্ন পরস্পর খেতে পারে । তবে এ নিয়ে কোনা জোরাজুরি চলে না । ধর , তুমি উপনয়ন নিয়েছ ও মােটামুটি সদাচার পালন করে চল , তাই বলে তােমার বাড়ীতে কোন বিপ্র আসলে যে বুড়ী তাকে রান্না ক'রে খাওয়াবে , সে কিন্তু ঠিক নয় । তার আলাদা রান্নার ব্যবস্থা করে দেওয়াটাই সমীচীন । যদি সে নাছোড়বান্দা হ'য়ে তোমাদের হাতে খেতে চায় , তাও প্রতিনিবৃত্ত করতে বিশেষভাবে চেষ্টা করা উচিত । যদি দেখ , তা'তে সে খুব ব্যথিত হ'চ্ছে , সে - ক্ষেত্রে এমনতর খাদ্য দিতে পার যাতে তােমার বা তার বৈশিষ্ট্য ব্যাহত না হয় । কিন্তু তােমাদের তরফ থেকে বিপ্রকে পক্ক অন্ন খাওয়াবার আগ্রহ অপরাধজনক । আমার মনে হয় , কোন সদাচারী বিপ্রের বাড়ীতেও যদি কোন সদাচারী বৈশ্য যায় , বিপ্রেরও তাকে জিজ্ঞাসা করা উচিত , সে স্বপাক খাবে কিনা , তাকে আলাদা পাকের ব্যবস্থা করে দেবে কিনা । তা'তে বৈশ্য হয়তাে বলবে — সে কি কথা ? আপনাদের প্রসাদ পাবার জন্যই তাে এসেছি । তখন তাকে নিশ্চিন্ত মনে অন্ন দেওয়া চলে । আর , বৈশ্য যদি স্বপাকী হয় , তবে বিপ্রও তার আলাদা পাকের ব্যবস্থা করে দেবে — সশ্রদ্ধভাবে , সাগ্রহে । নিজের ও অপরের বৈশিষ্ট্যকে শ্রদ্ধা ও সংরক্ষণ ক'রে চলাই সভ্যতার একটা গােড়ার কথা । বিপ্র যদি উদারতার নামে নিজের বৈশিষ্ট্য খােয়ায় তা'তে তার যেমন অকল্যাণ , অন্যেরও তেমনি অকল্যাণ । বিপ্রের যদি শ্রদ্ধাকর্ষী আচার না থাকে , তবে বিপ্রেতর বর্ণের শ্রদ্ধা সে আকষণ করতে পারবে না , তা'তে সে তাদের উপকারে লাগতে পারবে না । শ্রেয়ের প্রতি শ্রদ্ধাই মানুষের উৎকর্ষের একমাত্র পথ । তাই , শ্রেয় হ'য়ে যে জন্মেছে , তার চলন এমন হওয়া চাই যা'তে অন্যের অন্তরে শ্রদ্ধার উদ্বোধন হয় । তা'তেই সবার কল্যাণ । এয়ারী সার্ব্বজনীনতায় মানুযের কল্যাণ হয় না । নব্যযুবকেরা হয়তাে বলবে - এ - সব বু্র্জ্জোয়া মনােবৃত্তির পরিচায়ক । কিন্তু আমি কই - বাপু ! আমাদের যত গালাগালিই দাও , ভেবে দেখ -- তামরা যা কই তা'তে ব্যক্তিগতভাবে তোমার সুবিধা বজায় থাকে কিনা । আর আমি হলপ করে বলতে পারি --- আমাদের যা ’ কথা তা মেনে চললে কোন সত্তারই অসুবিধা হবার কথা নয় , তাবশ্য সবার প্রবৃত্তির পক্ষে তা রুচিকর না - ও হ'তে পারে । কিন্তু ভেবে দেখবি তো পাগল ! সত্তার জন্য প্রবৃত্তি , না , প্রবৃত্তির জন্য সত্তা ? প্রবৃত্তির তাঁবেদারি যদি করিস সত্তাকে দিয়ে , তুই দাঁড়াবি কোথায় ? বাঁচতে তাে চাস , না , মতলব অন্য কিছু ?✅
#Alochona_prosonge_part_3
#আলোচনা_প্রসঙ্গে_তৃতীয়_খণ্ড
#তৃতীয়_সংস্করণ
https://www.amritokatha.in/
Telegram https://t.me/amritokatha
www.facebook.com/Amritokatha.in1


10