নাম-ধ্যান-প্রার্থনা:-
বিজ্ঞানের সাহায্যে অনেক কিছু প্রমাণ করা যায়, কিন্তু বিজ্ঞান প্রার্থনার রহস্যকে প্রমাণ করতে পারে না। তাই নয় কি?
প্রশ্ন করলেন ইউজিন এক্সম্যান সাহেব শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রতি উন্মুখ দৃষ্টি রেখে। এক্সম্যান সাহেব নিউইয়র্কের হার্পার এণ্ড ব্রাদার্স নামের সুবিখ্যাত পাবলিশিং কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট। আমাদের গুরুভ্রাতা হাউজারম্যান-দার সাথে আমেরিকায় তিনি আলাপ-আলোচনা করে খুশি হন এবং সুদূর আমেরিকা থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর সন্দর্শনে দেওঘরে আসেন ১৯৬১ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর ।
শ্রীশ্রীঠাকুর পার্লারে বসে তামাক সেবন করছিলেন। একটু স্মিতহাস্যে সাহেবের দিকে দেখে তিনি বললেন— “বিজ্ঞান প্রার্থনাকেও প্রমাণ করতে পারে। এই যে আমি প্রার্থনা করি (হাত জোড় করে দেখিয়ে) তার কিছু ফল হয়ই। যেমন— এক রকমের গাছ আছে, তার সামনে যদি বীণা কিংবা বিশেষ বাদ্যযন্ত্র বাজাও, তবে গাছগুলি খুব তাড়াতাড়ি বেড়ে যায়। এর কারণ কী? আসলে সেই বাদ্যযন্ত্রের সুর থেকে এমন স্পন্দনের সৃষ্টি হয় যা ঐ গাছের মধ্যে এক রকমের thrill (স্পন্দন) -এর সৃষ্টি করে। এই thrill (স্পন্দন)-ই গাছের বৃদ্ধিকে সাহায্য করে। তেমনি প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে তার (প্রার্থনার) বিশেষ অর্থকে জীবনে ফুটিয়ে তুলতে হলে দেহে-মনে যে ব্যঞ্জনা বা স্পন্দন সৃষ্টি করতে হয়, প্রার্থনার মারফৎ সেই জিনিসের বার-বার অনুষ্ঠান করার ফলে দেহের কোষের মধ্যে সৃষ্টি হয় এক রকমের সম্বেগ, যার পরিণতিতে মনের ইচ্ছা সার্থক করবার উপযোগী যোগ্যতা মানুষের ভিতর উদ্ভিন্ন হয়ে ওঠে। যে কার্য- কারণের ফলে তা সম্ভব হয় তাকে জানা হচ্ছে বিজ্ঞান এবং বিহিত চলনে ঐ পরিণতিতে পৌঁছোনই হচ্ছে প্রার্থনা। যেমনিভাবে তা জানা যায়, তেমনিভাবে তা করতে হয় 'আমি জানি না'—এটা ফাঁক। সেটা জানলে আর ফাঁক থাকে না। প্রার্থনাকে যেমন করে Proof (প্রমাণ) করার দরকার, তেমন করে করতে হয় চেষ্টা করতে করতে হয়।”
আবার, অভিধানগত ভাবে প্রার্থনা কথার মানে—প্রকৃষ্টরূপে চলা । যে বিষয়ের জন্য আমি প্রার্থনা করি বা যা আমি চাইছি, তার পরিপূরণের জন্য বিহিতভাবে চেষ্টা করাই হ'ল প্রার্থনা।
প্রার্থনার ঠিক শব্দগত মানে তা হলেও প্রার্থনা করার মধ্যে আরো অনেক কিছু লুকিয়ে আছে। আমরা সমবেতভাবে সমন্বরে বিনতি প্রার্থনা করি, গুরুবন্দনা করি, ভজন করি, মন্ত্রপাঠ করি, স্তব-স্তুতি করি— তাও প্রার্থনা। গির্জাতে ভক্তেরা যীশুর গুণগান করেন, মসজিদে অসংখ্য লোক নমাজ পাঠ করেন,—তাও প্রার্থনা। আবার ঠাকুরঘরে বসে ইষ্টদেবের প্রতিকৃতির সামনে শুদ্ধাসনে বসে নাম-ধ্যান করা, ইষ্টমন্ত্র জপ করা— তাও প্রার্থনারই অঙ্গ। এ প্রার্থনা আবার অনেকে উঠে, বসে, নতজানু হয়ে প্রণাম করেও করে থাকেন। বুদ্ধদেবের অনেক ভক্ত আছেন যারা প্রতি পদক্ষেপে চলতে চলতে এক বিশেষ পদ্ধতিতে সাধনা করেন। গয়াতে বুদ্ধদেবের মন্দিরের কাছে এক অদ্ভুত সাধনার পদ্ধতি দেখা যায়। বুদ্ধদেবের মন্দিরের সামনের চত্বরে কয়েকটি (এক একটি প্রায় দু'হাত লম্বা) দু'হাত চওড়া কাঠের তক্তা পাতা আছে। কাঠটা মসৃণ। সেই কাঠের শেষ প্রান্তে একজন সন্ন্যাসী উবু হয়ে বসেছেন। তারপর দু'হাত পাশে রাখছেন, দুটো মোটা কাপড়ের টুকরোর ওপর। তারপর ডন দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত ঘটে সামনে ছড়িয়ে দিয়ে সাষ্টাঙ্গ হয়ে যাচ্ছেন। আবার ঐভাবে দেহটা গুটিয়ে এনে উবু হয়ে বসছেন। তারপর উঠে দাঁড়াচ্ছেন, হাত কপালে ঠেকাচ্ছেন। এভাবে বার বার করছেন, রাত দিন করছেন। এটাও এক প্রকারের যোগ-সাধনা। তা প্রার্থনারই অঙ্গ।
প্রার্থনাতে যা বললাম তা বোঝা উচিত। অনুভবে আনতে হবে। তদনুযায়ী কাজ করার প্রতিজ্ঞা করতে হবে প্রতিনিয়ত। প্রার্থনার বিশেষ সুর মনকে স্থির করে। কৌষিক ক্রিয়া-বিক্রিয়াকেও নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষ প্রার্থনার (স্তোত্রপাঠ ইত্যাদি) সুর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের মত কাজ করে ফুসফুস-সম্বন্ধীয় নানান রোগেরও দাওয়াই হিসেবে কাজ করে। যেমন, উপযুক্ত সুরে তাণ্ডব-স্তোত্র পাঠ করলে হাঁপানির উপশম সম্ভব। তা ঠাকুরেরই বলা। প্রার্থনা সাধারণতঃ দিনের নির্দিষ্ট সময়ে পরিচ্ছন্ন অবস্থায় করতে বলা হয়। আমরা (ঠাকুরের অনুগামীরা) তা করে থাকি সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময়। শারীরিক শুচিতা রক্ষার তাগিদে আমরা সেজন্য অনেক সময় মুখ-হাত-পা ধুয়ে প্রার্থনায় বসি। এরকম সদাচার পালনে দেহ সুস্থ থাকে। আর, রোজ ঐ একই সময়ে প্রার্থনার অভ্যেস আমাদের সময়-সচেতন করে তোলে। দিনের নানান কাজগুলি ঠিক সময়ে পরিকল্পনামত শেষ করার এ (দু'বেলা সময়মত প্রার্থনার অভ্যেস) যেন এক অন্যতম নিয়ন্ত্রক।
এবার আসি নামের কথায় নাম করা মানে বিশেষ একটি শব্দকে উপযুক্তভাবে বার বার আবৃত্তি করা। দীক্ষাগ্রহণের সময় এই বিশেষ শব্দটি দীক্ষাপ্রার্থীকে বলে দেওয়া হয়। যেহেতু নাম একটি শব্দবিশেষ, তাই বার বার এই আবৃত্তিতে দেহে একটি স্পন্দনের সৃষ্টি হয়। আমরা জানি, শব্দ যখন মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন সেই মাধ্যমে তিনটি ক্রমিক অবস্থার সৃষ্টি হতে থাকে।
প্রসারণ-সংকোচন-বিরমন—প্রসারণ-সংকোচন-বিরমন ...
একবার ঐ নাম ঠিকমত করলে তিনটি অবস্থার সৃষ্টি হয়। নাম করার পদ্ধতি সম্বন্ধে বলা হয়েছে, আজ্ঞাচক্রে (দুই ভুরুর সংযোগকারী সরল রেখা যেখানে নাসামূলকে ছেদ করেছে) মনকে স্থির করে নাম করতে হবে। মন মানেই অনেক চিন্তা। তা চিন্তাশূন্য হয় না। ইষ্টদেবতার মূর্তি ও ভাব ঐ সময় শুধু আজ্ঞাচক্রে কল্পনা করতে হয়। এতে মন কোন বিশেষ সময়ে একটি মাত্র বিষয়ে চিন্তা করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। আর স্বয়ং ঠাকুর যদি হন এই চিন্তা তাহলে সোনায় সোহাগা। এই সুযোগে তাঁর ওপর ভালোবাসাও বাড়তে থাকে। তাঁর কথা মেনে চলব, এমন ভাবও সৃষ্টি হয়। সামগ্রিকভাবে, আজ্ঞাচক্রে মন-স্থির করে নাম করার ফলে ওখানেই বিশেষ শব্দস্পন্দনের সৃষ্টি হয়। তা উপযুক্ত পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে (পিনিয়াল বড়ি, পিট্যুইটারি, গুরুমস্তিষ্ক ইত্যাদি অঞ্চল) নার্ভগুলিকে ঝাঁকুনি মারে। উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। বর্তমান বিজ্ঞানমতের একটি ধারণা অনুযায়ী আমাদের মস্তিষ্কে উপস্থিত কয়েক লাখ নার্ভকোষের মধ্যে মোটে কয়েক হাজার সক্রিয়। উপযুক্ত উদ্দীপনার প্রভাবে (নাম করা থেকে যার জন্ম হতে পারে ) তখন এইসব নিষ্ক্রিয় নার্ভকোষগুলি আস্তে আস্তে সক্রিয় হতে শুরু করে। ফলে মানুষের তীক্ষ্ণতা, বোধশক্তি, স্মৃতিশক্তি বেড়েই চলে। একেই হয়ত-বা বলে তৃতীয় চক্ষুর (Third eye) প্রকাশ বা ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের (Sixth sense) উন্মেষ।
আবার, সৃষ্টিতত্ত্বের একটি ধারণা অনুযায়ী দুনিয়ার সৃষ্টি স্পন্দন থেকে। ঠাকুর বলেন,—“নাম হল A composition of vibration through which the creation is created’। তাঁর মত
অনুযায়ী, – আমরা যে নাম করি তা ঐ শুরুর স্পন্দনের নিকটতম ভাষাময় প্রকাশ। অর্থাৎ, নাম করলে যে স্পন্দন সৃষ্টি হবে সেই স্পন্দন অনেকটা এই ব্রহ্মাণ্ডসৃষ্টির আদি স্পন্দনের মত। তাই, হয়ত নামের অনুশীলনে আমরা সৃষ্টির কারণের সাথে একাত্ম হতে পারি।
নাম করার ফলে মস্তিষ্কের নার্ভকোষে স্পন্দনের সৃষ্টি হয়। এরফলে নার্ভকোষের বিচিত্র ক্রিয়া-বিক্রিয়া ঘটতে থাকে। সম্মিলিত নার্ভকোষের এরকম ক্রিয়া-প্রক্রিয়া থেকে নানান শব্দ শোনার অনুভূতি হয়। আলো দেখা যায়। সাধকেরা এগুলিকেই অনেক সময় জ্যোতি দর্শন বা অতীন্দ্রিয় অনুভূতি বলে থাকেন। সমানে নাম করে যাওয়াই জপ। এটা চলতে- বলতে-বসতে-করতে সবসময় চলতে পারে। যেমন হৃৎস্পন্দন আপনা- আপনি চলে। নামের প্রবাহ শরীরে বজায় রাখাই জপের মূল লক্ষ্য। বিশেষ নামজপপদ্ধতির নামই আবার নামধ্যান। সাধারণতঃ শুচি দেহে, শুদ্ধ মনে, সুখাসনে, সোজা হয়ে আজ্ঞাচক্রে ইষ্টমূর্তি চিন্তা করে নাম করে যাওয়াই নাম-ধ্যান করার প্রকৃষ্ট বিধি। সম্মিলিতভাবে এই নাম আর ধ্যান করলে মানুষ যথাক্রমে তীক্ষ্ণতর এবং আরও গ্রহণক্ষমযোগ্য হয়ে ওঠে।
আজ্ঞাচক্রে ইষ্ট-মূর্তি চিন্তা সবসময় আসে না।তাই সামনে চক্র- ফটো অভ্যাস করলে আস্তে-আস্তে তা ধাতস্থ হয়ে ওঠে। চক্রফটো বলতে— একটি ঠাকুরের ছবি আর তার চারপাশে ক্রমিক সাদা-কালো দাগে একটি চক্র আঁকা। ঠাকুরের ছবিতে মন সহজে নিবিষ্ট করতে ঐ চক্র সাহায্য করে।
আবার, রোজ সবাশন করার কথাও ঠাকুর বলেছেন মোটামুটি শক্ত সোজা জায়গায় চিৎ হয়ে শুয়ে শরীরকে শিথিল করে দিতে হবে। অনেকটা শবাসনে যেমন করা হয়। এরপর নামজপ করতে হবে,- মিনিট পাঁচ-সাতেক। কিন্তু এবার ঐ ইষ্টমূর্তি চিন্তা করতে থাকা মনটি স্থির করতে হবে মস্তিষ্কের পেছন দিকটায় (শক্ত সমতলের সাথে মস্তিষ্কের সংযোগস্থলীয় অঞ্চলে)। সারাদিনের পরিশ্রমের পর বা দিনে দু-তিন বার ঐ রকম অবস্থায় করলে রক্তচাপ ঠিক হয়। টেনশান কমে। শারীরিক নানান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে সহজ যোগ তৈরি হয়। দেহ মন সতেজ হয়। দীর্ঘায়ু প্রদান এর চূড়ান্ত ফল।
মোটামুটিভাবে এই হল নাম-ধ্যান-প্রার্থনার গোড়ার কথা। আমাদের নিত্য অভ্যাসে তা জীবন্ত হয়ে উঠুক, সার্থক অনুভূতিতে। --



10