বিজ্ঞানী:-
এ তো মহা সমস্যা! কালিভর্তি দোয়াত আর কলম আলাদা করে ইস্কুলে নিয়ে যেতে হবে। তারপর, বারে বারে ঐ কলমকে দোয়াতের কালিতে ছুইয়ে ছুইয়ে লিখতে হবে। এত ঝামেলা সয় না। ‘একটা কিছু’ করতে হবে। ভাবনা, চিন্তা...। হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। ছোট্ট বাঁশের নল নিয়ে ওতে কালি ভরলেন। ওরই একদিকে লাগিয়ে দিলেন নিব। গাঁটের দিকে ছোট্ট ফুটোর ব্যবস্থাও হল। ব্যস্, তৈরী হয়ে গেল সুবিধের কলম। প্রয়োজনের তাগিদ আর সহজ বুদ্ধির জোরে সেদিন উদ্ভাবিত হল এখনকার আধুনিক ফাউন্টেন পেনের আদিম আর অসংস্কৃত রূপ।
মনের বিচিত্র খেয়ালেই একদিন তেতো খাওয়ার সখ হল। ভাটি গাছের পাতা চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেললেন। ভীষণ তেতো। তারই বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় পেটে ব্যথা শুরু। আর, অত্যধিক লালাক্ষরণে মুখে জোলো ভাব। এ ঘটনার কিছুদিন পরেই সমবয়সী আরেকটি ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ল। ঐ পাতা না খেলেও রোগের লক্ষণগুলি আগের মত। ঠাকুরের হঠাৎ কী মনে হল,- ঐ ভাটি গাছের পাতা এনে অসুস্থ ছেলেটিকে খাইয়ে দিলেন। ছেলেটিও সুস্থ হল। মনোবল বাড়ল তাঁর। চলল আরও পরীক্ষা। সিদ্ধান্তে এলেন, “যে গাছ সুস্থ অবস্থায় ব্যবহার করলে কোন একটা রোগের সৃষ্টি হয়, অসুস্থ অবস্থায় সেই লক্ষণ মিলিয়ে ব্যবহার করলে সেই গাছ সেই রোগেরও প্রতিকার করে।” হ্যানিমান প্রচলিত।
হোমিওপ্যাথী চিকিৎসার মূল সূত্রের সাথে এর মিল অনেকটাই।
‘ছোট্ট ছেলেটিই আবার বাবলা গাছের কাঁটাকে পিন করে দিব্যি গ্রামাফোনের মত যন্ত্রে রেকর্ড বাজান। কিংবা, দশ বছর বয়সেই বাবার সাথে স্টীমারে যেতে যেতে ইঞ্জিনের কারিকুরি দেখে নিজেই সেটার ছোটখাটো সংস্করণ বানিয়ে ফেলেন।
স্বচ্ছদৃষ্টি আর গোছানো চিন্তাই যদি বিজ্ঞান হয়, তবে এই মানুষটি নিশ্চয়ই সহজাত বিজ্ঞানী। ছাত্রাবস্থায় বিজ্ঞানের এক ফলিত রূপ নিয়েই তিনি পড়াশুনা করেছিলেন। ডাক্তারি পড়েছিলেন কলকাতার National Medical School-এ। যখন যা করতেন, তাতে নিমগ্ন থাকতেন। বলতেন, এভাবেই বোধের জন্ম হয়। আপাত অজানা জিনিসও ঐ চরম আগ্রহ-চিন্তার ফলে মাথায় খেলে যায়। (অনেকটা যেমন, বিজ্ঞানী কেকুলে অর্ধ-চৈতন্য অবস্থায় গাড়িতে যেতে যেতে যেভাবে বেঞ্জিনের অণু কেমন দেখতে তা বের করে ফেলেছিলেন)। এরপর তিনি গ্রামে যখন ডাক্তারি করতে এলেন, প্রতিষ্ঠা পেলেন ধন্বন্তরী হিসেবে। পর্যবেক্ষণ শক্তি এমনি স্তরে পৌঁছেছিল, — রোগী দেখামাত্রই রোগ আর ওষুধের নাম চোখের সামনে ভেসে উঠত।
এই ‘মানুষ’টিই প্রকৃতির নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে সময়ে গড়ে তুলেছিলেন বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র। হিমাইতপুর-পাবনা-বাংলাদেশে। অন্যতম কর্ণধার হিসেবে পেলেন অনুগামী ভক্ত বিজ্ঞানী শ্রীকৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য (ফ্রাস্ট ক্লাস, গোল্ড মেডালিষ্ট, পদার্থ-বিজ্ঞান, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) ঠাকুরের অনুগত ভক্ত ছিলেন এবং নোবেলজয়ী রমনের বিজ্ঞানসন্ধানী-সহযোগী ছিলেন। শ্রী কিরন চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়েও একজন বিজ্ঞানী এবং ঠাকুরের একাত্ত অনুরাগী ভক্ত ছিলেন। শুরু হল নানান বিষয়ে গবেষণা আবহমণ্ডলের আয়নোস্ফিয়ার (তড়িৎযুক্ত স্তর) থেকে সংযোগ সাধন করে বিদ্যুৎ-উৎপাদনের দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা। রূপোর সূতো দিয়ে ঘুড়ি উড়িয়ে লাটাইয়ে ‘কারেন্ট’ পাওয়া গেল। প্রকৃতির বাতাসে বড় বড় পাখা ঘুরিয়ে উৎপন্ন করা হল ‘Wind Power Electricity’. তা দিয়ে আশ্রমে লাইট জ্বলল। মেশিনের চাকা ঘুরল।
পরিকল্পনা ছিল ‘Bio- motor’ কিংবা ‘Vibr ometer’ যন্ত্র উদ্ভাবনের, যা দিয়ে অবিকৃত - মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তোলা যেতে পারে। দেশীয় গাছ-গাছড়া আর তাদের ঔষধি গুণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুললেন ‘রসৈষণা মন্দির’। নানান রোগের অনেক ওষুধ সহজেই মানুষের প্রিয় হয়ে উঠল।
মানুষের আকুল জিজ্ঞাসায় ও প্রয়োজনের তাগিদে ঠাকুর অনেকগুলি ওষুধ আবিষ্কার করেন এবং সেগুলির ফরমূলা স্বয়ং তাঁরই। প্রত্যেকটি ওষুধই অব্যর্থ। যেমন নিম্ব মনজিষ্টারিষ্ট (উদরাময়, অতিসার, আমাশায় প্রভৃতিতে ব্যবহৃত), অশোকাদি অরিষ্ট (রজঃস্রাব, শ্বেত ও রক্ত প্রদর, বাধক রোগ নিবারক), ঊশীরকম্পাউণ্ড (স্নায়বিক ও ধাতু দৌর্বল্যে ফলপ্রদ), কার্ডোটোন বা হৃদ্বল (হৃদয়যন্ত্রে বলকারক ঔষধ), হেপাটোন (লিভারের একটা আদর্শ টনিক), কুম্বমালিনী অরিষ্ট (রক্তের উচ্চ ও নিম্ন চাপে ফলপ্রদ), অশ্বগন্ধারিষ্ট, প্রিভেন্টিনা, উৎপলাদি কষায়, পর্নাশ পঞ্চক, নবরঞ্জনী আরো কত কি?
আশ্রমের প্রাণপুরুষ ‘তিনি’ নানান বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সূত্র ধরিয়ে দিতেন। যুক্তিময় চিন্তার বিচিত্র কাজের ঝোঁক। জীব-জন্তু বা ফলের
ভ্রুণকে কাঁচ-পাত্রে রেখে উপযুক্ত শক্তি প্রয়োগে কিভাবে তাদের অন্য জীবের ভ্রূণে পরিণত করা যায়, তার কথাও ভেবেছেন। এখনকার এই সময়ে আমাদের কাছে এই পদ্ধতির চিন্তা তেমন নতুন নয়। কোষের মধ্যেকার ক্রোমোজোমে রশ্মি (আলট্রা ভায়োলেট) পাঠিয়ে বা অন্য উপায়ে ওর জিনসজ্জাকে এদিক ওদিক করতে পারলেই নতুন বৈশিষ্ট্য ওয়ালা জীবের জন্ম হতে পারে। ভাবতে অবাক লাগে, যে সময় জিন- ক্রোমোজোম্-ডি. এন. এ. নিয়ে সারা পৃথিবীতে বলার মতো তেমন কাজকর্মই হয়নি, সেইসময় তিনি এখনকার ‘জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং’- এর চরম প্রয়োগের কথা বলেছিলেন। অতি প্রচলিত ‘মিউটেশান টেকনিক ধারণা দিয়েছেন বাস্তব বুদ্ধির জোরে।
গোপাল চন্দ্ৰ মুখার্জ্জিদা M. Sc. একজন বিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি ঠাকুরের কথাগুলি খুব ভাল বুঝতে পারতেন এবং ঠাকুর তার দ্বারা T.B. রোগের ওষুধও বের করেছিলেন। বীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যদা (B. Sc.) কেমিকেলের সাথে প্রথম থেকেই যুক্ত। ঠাকুর তাকে অনেক ফরমূলা দিয়েছেন। তার দ্বারা অনেক ওষুধ তৈয়ার করেছেন। তিনি অকৃতদার ও ঋষিতুল্য ব্যক্তি। পরবর্তী সময়ে বহু বিজ্ঞানী জ্ঞান চন্দ্র ঘোষ, সত্যেন বসু, প্রশান্ত চন্দ্র মহালানবিশ পাবনা আশ্রমের ‘বিশ্ব বিজ্ঞান কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং ঠাকুরের সাথে আলাপ করে তাঁর পরমবিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক ভাবধারার সাথে পরিচিত হয়ে মহাবিস্মিত হয়ে যান।
স্বপ্ন ছিল শাণ্ডিল্য বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির। দেশ-বিদেশের সৃষ্টিশীল জ্ঞান-বিজ্ঞান যেখানে চরম উৎকর্ষ লাভ করবে। পারস্পরিক যোগসূত্র খুঁজে পাবে। অভিনব চিন্তাধারার জনক তিনি। ইচ্ছে করতেন, পশুপাখিদের ভাষাও এখানে শেখানো হবে। নিজের মত করে তার কাজও শুরু করেছিলেন। দেওঘর সৎসঙ্গ আশ্রমের বিরাট চিড়িয়াখানা সৃষ্টির পেছনে অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এটাই।
সাঁওতাল পরগণার দেওঘরের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে দারোয়া নদী। তার ব্যাপ্তি অনেক হলেও জল ওতে নেই বললেই হয়। এখান থেকে গঙ্গার দূরত্ব কমসে কম্ শ কিলোমিটার। ক্যানাল কেটে যদি গঙ্গাকে দারোয়ার সাথে জুড়ে দেওয়া যায়, – আদিবাসী অধ্যুষিত প্রস্তরময় এই শুকনো অঞ্চলে সারা বছর চাষাবাদ সম্ভব। কিন্তু দারোয়ার উচ্চতা গঙ্গার চেয়ে বেশি (সমুদ্রের সাপেক্ষে)। জল ওপরে আসবে কিভাবে? তার উপায়ও ঠাকুর উপস্থিত ইঞ্জিনিয়ারদের বুঝিয়ে বলতেন। ওঁর এই পরিকল্পনার নাম ছিল ‘গঙ্গা-দারোয়া প্রজেক্ট।’
দারোয়া থেকে গঙ্গা নদী (সুলতানগঞ্জের) প্রায় ৬০ মাইল দূরে অবস্থিত। ঠাকুর বিহারের মুখ্যমন্ত্রী পণ্ডিত বিনোদানন্দ ঝাকে বলেছিলেন—আপনি দারোয়া নদীকে বহতা করে দেন গঙ্গাকে এনে। আপনি ‘ভগীরথ’ হয়ে যান। সারা সাঁওতাল পরগনা ধনধান্যে ভরে উঠবে। পরে দারোয়া থেকে শিবগঙ্গাতে (দেওঘরের মন্দিরের সংলগ্ন) এনে গঙ্গাকে যুক্ত করেন। তীর্থযাত্রীরা শিবগঙ্গাতে স্নান করে শিবমন্দিরে পূজা দেবে। কি আনন্দ হবে। সবাই সেদিন ঠাকুরের এসব কথা শুনে উচ্ছ্বসিত ও আনন্দিত।
নজর ছিল সব দিকেই। হিমাইতপুরে তাঁর ইচ্ছেতেই গড়ে উঠল ধাত্রী বিদ্যালয়। মেয়েদের স্কুল কম্পাউণ্ডে নানান গাছপালা লাগানো হল। তাতে আবার গাছের নাম, গুণ লিখে রাখার বন্দোবস্ত হল। চলতে- ফিরতে জীবনের টুকিটাকি গুছিয়ে নেওয়া।
পাবনায় টিউবওয়েলের বড়ই অভাব। কন্ট্রাক্টারের মারফৎ তা বসালে অনেক খরচ। অতএব, আশ্রমিকেরা নিজেরা টিউবওয়েল বসানোর কাজ শিখে দক্ষতালে তা বিভিন্ন জায়গায় বসাতে শুরু করল। সমস্যা ছিল মাটিতে জলের স্তরটা খুঁজে পাওয়ার। ঠাকুরের কাছে বলতে ভাবনা-চিন্তা করে ঠাকুর ওদের সাহায্য করলেন। এ ঘটনা থেকে গড়ে উঠল ‘Satsang Engineering & Mechanical Workshop.’ তার পরিধি এক কাজ থেকে আরেক কাজে বেড়েই চলল।
ভালোবাসার নজর থেকে কারোর রেহাই নেই। ‘ঠাকুর’ প্রকৃতিপ্রেমিক পরিবেশবিদ। একটা গাছও যদি তোমার জানলার কাছে থেকে তোমার ঘরে আলো-বাতাস ঢোকার অসুবিধে করে, তবু গাছটাকে কেটো না—এ তাঁরই কথা। ভাবতেন, প্রত্যেক ঘরে যদি - একটি বাগান আর ছোটখাটো ল্যাবরেটরি থাকত ...।
পুরোপুরি বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে তাঁর বই ‘বিজ্ঞান-বিভূতি’ (আর আছে ‘স্বাস্থ্য ও সদাচার সূত্র’) রচিত হলেও তাঁর নানান বইয়ে বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনার আনাগোনা। জীবনের প্রথম ইংরেজি বাণীটিও সৃষ্টিতত্ত্ব প্রসঙ্গে। নানান ইংরেজি বিজ্ঞানশব্দের বাংলা রূপ দিয়েছেন স্বয়ং। যেমন, —
• Chromosome - ক্রমজম
• Gene - জনি
• Zygote - অঙ্কীডিম্ব
• Lines of magnetic force চুম্বক-শক্তিসংলেখা
• Quanta - অণিকা
• Mechanism মরকোচ
• Ellipse বৃত্তাভাস
এরকম আরও কত কী!
চলতে-ফিরতে, উঠতে-বসতে নানান কাজের ফাঁকে ক্রমান্বয়ে উদ্ভাসিত করেছেন প্রজননতত্ত্ব থেকে সৃষ্টিরহস্য, চিকিৎসাবিদ্যা থেকে পরমাণুবিজ্ঞান, শব্দতত্ত্ব থেকে স্থাপত্যশিল্পের দিকগুলি। আয়ুর্বেদ বিজ্ঞানে ছিল বিশেষ নজর। তাঁর কাছে আসা সম্ভাবনাময় মানুষদের বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে উৎসাহ দিতেন। প্রয়োজনে বিদেশ গিয়ে সমসাময়িক জ্ঞান অর্জনে মোটেই আপত্তি ছিল না। কোন কোন দিন ঘন্টার পর ঘন্টা শ্রী কৃষ্ণপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্যের কাছে বর্তমান বিজ্ঞানপ্রগতির কথা শুনতেন। বলতেন। পৃথিবীর নানান দেশ থেকে অজস্র বিজ্ঞানের বই জোগাড় করে অনুগামীদের দিয়ে রীতিমত ধারাবাহিক বিজ্ঞানচর্চা করিয়েছেন।
সব মিলিয়ে তাই তিনি যেন, — ‘বিজ্ঞানী’।
“তাই বলি—
ধারণার ঘুঘু সেজে
পণ্ডিত হয়ে বসে থেকো না,
দেখ, শোন, স্পর্শ কর,
যেখানে গন্ধ নেওয়া যায়-
গন্ধ নাও,
আর, কোথায় কোন্টা কী ভাবে
লাগাতে পারা যায়—
সঙ্গতিশীল তৎপরতায়
সেটাকেও অনুধাবন ক’রো,
তবে তো বুঝকে সলীল ক’রে
তুলতে পারবে!
আর, ঐ বাস্তব ধারণাই
তোমার ধৃতি-সম্বেগকে
পটু ক’রে তুলে
তোমাকে বিজ্ঞতায় অধিষ্ঠিত ক’রে তুলবে।”
--শ্রীশ্রীঠাকুর



10