অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য করণীয় -৮৯
বংশকুলজীর গুরুত্ব-৯০
নারীস্বাধীনতার প্রকৃত স্বরূপ-৯১
বিবাহের গুরুত্ব- ৯১
সুখী দাম্পত্যজীবনের চিত্র-৯১,৯২
শ্বশুরবাড়ীই মেয়েদের পরীক্ষাগৃহ-৯২
ডাইভোর্স-৯৩
দেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে কা'রা'-৯৩
প্রতিলোম-৯৩
বিধবা-বিবাহের ক্ষেত্র-৯৩
তথাকথিত আন্দোলনের কুফল-৯৪
দ্বিচারিণী স্ত্রীর সন্তান কেমন হয়-৯৪
ভারতীয় জাতি সম্পর্কে গৌরব- ৯৪
[89- 95]
শ্রীশ্রীঠাকুর ওখানে এসে বসার পর শ্রীশদা ( রায়চৌধুরী ) তাড়াতাড়ি বাড়ী থেকে বেরিয়ে এলেন । শ্রীশ্রীঠাকুর শ্রীশদাকে বললেন — আপনি ঋত্বিকতা করন আর যাই করুন , ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের চর্চ্চা কিন্তু বজায় রাখবেনই । কত সস্তায় , কত সুন্দর , মজবুত আরামপ্রদ বাড়ী তৈরী করা যায় , সে ধান্ধা কিন্তু মাথায় রাখবেনই ; শুধু , বাড়ী নয় , টিউবওয়েল আর স্যানিটারী ল্যাট্রিনও যাতে ঘরে - ঘরে অল্প খরচের মধ্যে সুন্দর করে করা যায় , তা'ও দেখতে হয় । লােকের জীবনীয় স্বাচ্ছন্দ্য যা'তে বাড়ে , রােগ - মহামারী যা'তে কমে তার ব্যবস্থা করতে হবে , আর মানুষের আয় - উপার্জন বাড়াবার জন্য ঘরে - ঘরে কিছু - কিছু , কুটির শিল্পের প্রবর্তন করা চাই । কুটির - শিল্পের উপযােগী ছােট - ছােট যন্ত্রপাতিও কতকগুলি বের করতে হয় , যা খাটিয়ে বাড়ীর মেয়েরাও দু'পয়সা উপায় করতে পারে । মানুষ অলস থাকে ততক্ষণ , যতক্ষণ কাজের সুখ টের না পায় । লাভপ্রদ কাজ পেলে মানুষ কেন করবে না । দেশের লােকের অভ্যাস অনেক খারাপ হ'য়ে গেছে , সে - বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই । কিন্তু এদের পিছনে খাটলাে কে বলুন তাে ? ফাঁকা কথায় কি কাজ হয় ? মানুষগুলির পিছনে লেগে থাকা লাগে । গুরু , পুরােহিত , ঋত্বিক ঘটক ও ব্রাহ্মণের এই হ'লাে কাজ । আপনি একে বিপ্র , তায় ঘটক , তারপর ঋত্বিক , তায় আবার ইঞ্জিনীয়ার । আপনার চলনার মধ্যে সবগুলি যদি সুসমঞ্জস হ'য়ে ফুটে ওঠে , কী যে হয় কওয়া যায় না । আজ যদি দেশে প্রকৃত ঘটক থাকতো , আর ঘটকের সম্মান যদি ঠিক থাকতো , তবে কি দেশের এই দশা হয় ?
শ্রীশদা ঘটকচৌধুরী আমার পূর্ব্বপুরুষের উপাধি , তদতিরিক্ত আমি তাে কিছু জানি না ।
শ্রীশ্রীঠাকুর -- তা ' জানবেন কেন ? আপনারা যে এখন up - to - date(আধুনিক ) হইছেন । ঘটকরা আগে কত - সব বংশের বংশপরিচয় জানতো আর এই জানার ফলে তারা বিয়েথাওয়ার মিল এমন - ক'রে ক'রে দিতে পারতাে যা'তে দেশে ভাল - ভাল মানুষের আমদানী না হয়েই পারতাে না । বাবার কাছে শুনেছি , আগে ঘটকরা বিয়ের ব্যাপারে সব চুলচেরা বিচার করতাে , বিচার - সভা বসতাে , প্রবীণ মাতব্বর যারা তারা সে - সভায় যােগ দিত , ঘটকের বিচারে ভুল হ'লে ধান দিয়ে তাদের কপাল কেটে দিত । ঐসব ঘটকদের কথা শুনেছি , তারা নাকি mathematical accuracy ( গাণিতিক যাথার্থ্য ) নিয়ে বলে দিতে পারতাে , এই ছেলের সঙ্গে এই মেয়ের বিয়ে হ'লে , এই ক'টি সন্তান হবে , তার মধ্যে আবার ক’টি ছেলে , ক’টি মেয়ে তা'ও বলে দিতে পারতাে , কোন সন্তানটি কেমন মেকদারের হবে , তাও নাকি ব'লে দিতাে । শুনলে রুপকথার মতাে মনে হয় , কিন্তু কিছুই অসম্ভব নয় । যুগ - যুগ ধ'রে বংশপরম্পরায় ঐ কাজ ক'রে - ক'রে তাদের এমন একটা অভিজ্ঞতা জন্মেছিল , যার ফলে তারা এমনটা পারতাে । আর , এটা তাে একটা আজগবী ব্যাপার কিছু নয় । Science of Genetics ( জনন - বিজ্ঞান ) , Science of Eugenics (সুপ্রজনন - বিজ্ঞান ) , Science of Heredity ( বংশানুক্রমিকতা - বিজ্ঞান ) ইত্যাদি কথা আমরা তাে আজকাল হামেশা শুনি । তাদের ছিল practical knowledge of genetics ( জনন - বিজ্ঞান সম্পকে বাস্তব জ্ঞান ) । ঐ জ্ঞানভাণ্ডার উন্মােচন করতে হয় , আর তার সঙ্গে জুড়ে দিতে হয় genetics , cugenics ও hcredity সম্বন্ধে বৰ্ত্তমান বিজ্ঞান যে - কথা বলছে সেই জ্ঞান । এর ভিতর - দিয়ে যে কত উপকার হতে পারে , তা বলে শেষ করা যায় না । বিয়ের ব্যাপারে আগে ঘটকদের অনুশাসন না মেনে উপায় ছিল না , কিন্তু পরে নব্যশিক্ষিত যুবকরা তাদের আর মান্য করতে চাইলাে না । ধরেন , আপনি B. Sc . B. L. , Enginecr- আপনার জন্য মিল ক'রে যদি একটা কালো মেয়ে ঠিক করে দিত , তাহ'লে তাে আপনি চটিতং । ( শ্রীশ্রীঠাকুর ও উপস্থিত সকলে মৃদু - মৃদু , হাসছেন) কিন্তু সহধর্মিণী ও জায়া হিসাবে সেই - ই হয়তাে আপনার পক্ষে সর্ব্বোত্তম । কিন্তু ঘটকের কথা যদি না বিকায় , তার মানে - মানে বিদায় হওয়া ছাড়া উপায় কী ? এমনি ক'রে আস্তে - আস্তে ঘটকদের প্রভাব - প্রতিপত্তি কমে গেছে । শ্রীশদা - টাকার লোভে ঘটকরা বহু , বাজে বিয়েও ঘটিয়ে দিত , অটল চালিয়ে দিত ।
শ্রীশ্রীঠাকুর-- এগুলি হ'লে বিকৃতির কথা । সমাজ তাদের দেখে না ; পেটে মারা যায় , তখন তারা করে কী ? তাই বলে আমি এই মনােবৃত্তি সমর্থন করছি না । তবে আপনারা যদি লাগেন , ভােল ফিরিয়ে দিতে বেশীদিন লাগে না । যেখানে - যেখানে যাবেন , দেখবেন যাদের কুলজী আছে , তারা যেন তা ' নষ্ট না করে । কুলজী মানে কুলের genealogical ( বংশমিক ) ইতিহাস । মানুষ বংশ - গরিমা সম্বন্ধে যদি সচেতন না হয় , সশ্রদ্ধ না হয় , তবে দেশপ্রেম , বিশ্বপ্রেম ইত্যাদি হবে আলগা - আলগা , তার কোন ভিত থাকবে না । আর , বংশ মিলিয়ে বিয়ে না দিলে , দাম্পত্য জীবন ঠিক না হ'লে , শুভসংস্কারসম্পন্ন মানুষ পয়দা না হ'লে - দেশ , দুনিয়া রসাতলে যেতে বসবে । আমাদের দেশে সতীত্বের কত আদর ছিল , একদিন আমাদের দেশে মেয়েরা স্বামীর সঙ্গে সহ মরণে যেতে পৰ্য্যন্ত কুণ্ঠিত হতাে না । জিনিসটা অবশ্য পরে বিকৃতিলাভ করেছিল এবং তা রহিত হয়েছে ভালই হয়েছে , কিন্তু এর মুল কোথায় সেটা তলিয়ে দেখতে হবে তাে ? সত্যিই একসময় আমাদের দেশে এমন - সব মেয়ে ছিল যারা স্বামীবিহনে বেচে থাকার চাইতে স্বামীর সঙ্গে - সঙ্গে চলে যাওয়া কাম্য মনে করতাে , আর করতোও তারা তাই । মরে যাওয়ার বুদ্ধিকে আমি প্রশংসা করি না বটে , কিন্তু এর পিছনে যে অনুরাগের তীব্রতা আছে তাই - ই হ'লাে পরম অমৃত । ঐ একনিষ্ঠ ভক্তি - শ্রদ্ধাই মানুষকে জন্ম - মৃত্যুর ঊর্দ্ধে নিয়ে যেতে পারে , এই - ই তাে মুক্তির রাজপথ । তার বদলে কিনা পাশ্চাত্ত্যের নারী - স্বাধীনতা - আন্দোলন আজ আমাদের দেশের মেয়েদের কাছে পরম লােভনীয় ব'লে মনে হচ্ছে । নারী - স্বাধীনতা ক'রে - করে তাে আজ সেখানে ঘরে - ঘরে অশান্তির আগুন জ্বলছে । আমরা তাে মন খারাপ হ'লে আর কোথাও না পারি , ঘরে এসে বৌয়ের কাছে একটু তম্বিতম্বি করতে পারি । বৌ - ও সেটা বােঝে , ভাবে -- এখন ওর মন খারাপ , রেগে গেছেন , এখন আমি কোন কথা ক'ব না , ভয়ে - ভয়ে তােয়াজ করে মাথা ঠাণ্ডা করে । পরে আবার দু'জন মিলে হাস্য রসিকতা করে । দুঃখ - কষ্টের মধ্যদিয়েও এইভাবে সংসার চলে , শান্তি নষ্ট হয় না । যে - স্ত্রী এমন ক'রে স্বামীকে , তার আপনজনকে সয় , বয় , সেই আবার সংসারে সাম্রাজ্ঞী হ'য়ে ওঠে । তার কথা ছাড়া তখন সংসার চলে না । স্বামী , শ্বশুর , শাশুড়ী সকলেই তার মতামত জিজ্ঞাসা করে , দিন যেতে - যেতে তার উপর সব কর্তৃত্ব ছেড়ে দেয় । এইভাবে একটা সংসারের অধীন হ'য়ে , ভালবেসে , সেবা দিয়ে , দুঃখ স'য়ে সকলকে আপনার ক'রে নিয়ে যে আধিপত্য ও স্বাধীনতা অর্জন , তার মধ্যেই তাে নারীস্বাধীনতার মধুমর্ম্ম । আমি বুঝি- Co operative interdependent scrviccablc run of life is libcrty ( সহযােগী পারস্পরিক নির্ভরশীল সেবাপ্রাণ জীবনগতিই হচ্ছে স্বাধীনতা ) । নইলে , পাশ্চাত্যে তাে শুনেছি , স্ত্রীর সঙ্গে একটু রূঢ়ভাবে কথা কইলে crucl treatment ( নিষ্ঠুর ব্যবহার ) -এর অভিযােগে স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে divorce suit ( বিবাহ - বিচ্ছেদের মামলা ) আনতে পারে । বলেন তো সেখানে পুরুষ গুলির কী দুর্দ্দশা ! স্ত্রী যদি অন্যায় করে , তা'তেও তাে স্বামীরা তাদের । শাসন বা সংশােধন করতে পারে না । ভয়ে - ভয়ে চলে , ভাবে ক্ষেপিয়ে কাজ নেই , কোন সময় ছেড়ে চলে যাবে । তখন কাচ্চাবাচ্চারা আমার বিপদে পড়ে যাবে। কিন্তু এই যে গোঁজামিলের সংসার , সংশয়ের সংসার , এর মধ্যে কি কোন শান্তি থাকে ? ওখানকার জীবন আজ তাই বিষিয়ে উঠেছে । শুনছি , ওদেশে নানাপ্রকার মানসিক রােগগ্রস্তের সংখ্যা দিন - দিন বেড়ে যাচ্ছে । এইভাবে যদি চলে , তাহ'লে আরাে বাড়বে । আমি বলি - এই আমরা কুড়েঘরে পান্তাভাত খেয়ে ওদের তুলনায় এইদিক দিয়ে ঢের ভাল আছি । যে বৌকে খেতে দিতে পারে , সেও জানে , বৌয়ের উপর তার অধিকার আছে , আর বৌ - ও বােঝে , পেরে ওঠে না , কী করবে , যাহােক সে যদি আমার বেচে থাকে , তাহলে আমার শাঁখাসিন্দুর সুখসােহাগ কেউ কেড়ে নিতে পারবে না , আর মানুষের দিন চিরকাল একভাবে যায় না , একদিন সুদিনের নাগাল পাবই । তুলসীতলায় পিদিম দিতে - দিতেও সে স্বামী - পুত্রেরই মঙ্গল প্রার্থনা করে । অচলটা কানের পাশ দিয়ে টেনে দেয় ( হাত দিয়ে দেখালেন ) , গড় হ'য়ে প্রণাম করে , প্রণাম সেরে উঠে বারবার ভক্তিভরে কপালে হাত ঠেকায় — সংসারের কল্যাণ - কামনায় । মনে মনে কত সময় ভাবে — উনি তাে কত রকমে চেষ্টা করেন , কিছুতেই তাে সংসারের সুসার হচ্ছে না , হয়তো আমারই কৰ্ম্ম খারাপ , ভাগ্য খারাপ , আমার কর্মফলে উনি বােধ হয় দুর্ভোগ ভুগছেন , নইলে ওনার মতাে মানুষের তাে কষ্ট হওয়া উচিত নয়। ফঁৎ করে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে পড়ে নিজের অজান্তে । মনে - মনে বলে - পরমপিতা ! আমার ' সব অপরাধ ক্ষমা কর , আমার কর্মের জন্য অমন ভাল মানুষটিকে , আমার এই নিরপরাধ বাছাদের কোন কষ্ট দিও না । ভেবে দেখেন তাে , যে - সংসারে এতখানি প্রীতি , এতখানি মমতা , দারিদ্র্যদীর্ণ হ'লেও তাে সে সংসার স্বর্গ । ওই স্ত্রীর হাতের শাকান্নও তাে রাজভােগের বাড়া । এটা ভাবের কথা নয় , বাস্তবেও তাই । শ্রদ্ধাদীপ্ত , প্রীতিসিক্ত যে সেবা , তা ' মানুষের সত্তাকে স্পর্শ ক'রে সবরকম cell ( কোষ ) -কেই nourish ( পুষ্ট ) করে । আবার , স্ত্রী যদি অমনতর অনুরাগিণী হয় , তার প্রেরণায় তার স্বামীর সবদিক দিয়ে উন্নতি হবেই । তাই , সংসারে মেয়েদের বলে লক্ষী । কপালে মানুষ যারা , তাদের বৌ সক্ষম হয় । আমার কপাল ভাল , তাই বড় বৌয়ের সঙ্গে বিয়ে হইছিল । এই বড়বৌ - ই কি কর্ত্তামার কাছে কম গাল খাইছে ? গালায়ে ভূত ছাড়ায়ে দিতেন । ও চুপ করে থাকতো , টু শব্দটি করতাে না । বুঝে - বুঝে হাতের কাজ কা'ড়ে করতাে । তাতে কর্ত্তামা খুব খুশি হতেন । আদর করে খাওয়াতেন । এতসব পাশ ক'রে আসে তবে না আজ বড়বৌ বড়বৌ । মেয়েদের বড় university ( বিশ্ববিদ্যালয় ) হ'লাে তাদের শ্বশুরবাড়ী । ঠাকুর - দেবতা , পূজা - পার্বণ , শ্বশুর - শাশুড়ী , জা - জাওয়ালী , দেওর - ভাসুর , ননদ - ভাগ্নে , আত্মীয় - কুটুম্ব , স্বামী - পুত্র , পাড়া - পড়শী , চাকর বাকর , গরু - বাছুর , গাছ - গাছালি ইত্যাদি সবার ও সব - কিছুর সেবাচৰ্য্যা নিয়ে সংসার । সব দিক তাল সামলিয়ে সবাইকে খুশি রাখা চারটিখানি কথা নয় । আলস্য থাকলে হবে না , বদমেজাজকে বিদায় দিতে হবে , হীনম্মন্যতাকে বাদ দিয়ে সশ্রদ্ধভাবে , প্রসন্নচিত্তে গুরজনের শিক্ষা ও শাসন মাথা পেতে নিতে হবে । তবেই মেয়েরা পাশ হ'তে পারবে । আবার , তাদের গর্ভে সন্তানও জন্মাবে তেমনি তুখােড় — অবশ্য যদি বিয়ের ব্যাপারে পূর্ণ সঙ্গতি থাকে । আজকাল এক রেওয়াজ হয়েছে , ছেলেরা বিয়ে ক'রে স্ব - স্ব কর্মস্থলে বৌ নিয়ে একা থাকতে চায় , মেয়েরাও সংসারের দশজনের ঝামেলা সইতে চায় না , স্বামীকে নিয়ে আলাদা থাকতে পারলেই আহ্লাদ অনুভব করে , এ কিন্তু ভাল নয় । দশজনের সংসারে conflict ( সংঘাত ) -এর মধ্যে থেকে যে যত adjust ( নিয়ন্ত্রণ ) ক'রে চলতে পারে , সে তত বড় হয় । তথাকথিত সুখ , আরাম ইত্যাদি জিনিস মানুষের পক্ষে লাভজনকও নয় , লােভনীয়ও নয় । মানুষের পক্ষে লাভজনক ও লােভনীয় জিনিস হলাে তার ইষ্টানুগ আত্ম - নিয়ন্ত্রণ । আমাদের আর্য্য - হিন্দুসমাজের বিধি - বিধান ঐটেকে লক্ষ্য করে । সবসময় বৃদ্ধিকেমন ক'রে ওর ( ইষ্টানুগ আত্মনিয়ন্ত্রণের ) scope ( অবকাশ ও সুযোেগ ) বাড়িয়ে দেওয়া যায় । Divorce- এর ( বিবাহ - বিচ্ছেদের ) মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের বালাই নেই । আমি বলি , একটা বিয়ে যদি মনঃপূত নাই হয়ে থাকে , তাই বলেই কি বিয়েটা নাকচ করে দিতে হবে ? অবশ্য কতকগুলি ক্ষেত্র আছে যেখানে বিয়েটাই সিদ্ধ নয় । যেমন প্রতিলােম বিয়ে শাস্ত্রসিদ্ধ নয় , বিয়েই যদি সিদ্ধ না হয় , সেখানে divorce ( বিবাহ - বিচ্ছেদ ) -এর কথা আসে না । তবে প্রতিলােম কোন মিলন হ'লে শাস্ত্র বলছে — সেখানে সে - মেয়েকে হরণ ক'রে শ্রেয় বরে অর্পণ করাই পূণ্য কৰ্ম্ম । কারণ , তার ভিতর - দিয়ে সমাজ মহা অনিষ্টের হাত থেকে রেহাই পায়। তা ছাড়া আছে -- নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ , পঞ্চস্বপৎসু , নারীণাং পতিরন্যো বিধিয়তে ।’ এ বিধানও আছে মন্দের ভাল হিসাবে । ‘ মৃতে’ কথা আছে ব’লে অনেকে বলেন যে - কোন বিধবার বিবাহ হ'তে পারে । কিন্তু সন্তানবতী বিধবার বিবাহ হওয়া উচিত নয় । বালবিধবা যারা , স্বামীর ছাপ মাথায় পড়তে না পড়তে যেখানে স্বামী মারা গেছে , সেইসব বিধবাদের মাত্র বিবাহ দেওয়া চলতে পারে । বিধান দেওয়া আছে ব'লে প্রত্যেককে যে অন্য পতি করা লাগবে , এমন কথা নয় । তেমন খাঁটি মেয়ে যারা তারা পুনর্বিবাহে রাজী হওয়া তাে দুরের কথা , বাগদত্তা হ'য়ে সেখানে বিয়ে না হ'লে অন্যত্র বিয়ে করতে চায় না । এই রকমটা আমার নিজের ভাল লাগে । গোঁড়ামীওয়ালা নিষ্ঠা দেখলে আমার মাথাটা কেমন যেন শ্রদ্ধায় নােয়ায়ে আসে । তার মধ্যে যেন আমি ভারতের মানচিত্র দেখতে পাই । ভারতের কৃষ্টি যে অমর আয়ু নিয়ে বেচে আছে ও বেচে থাকবে সে তাদের দৌলতে । মনে রাখবেন , আপনারা কেতাবী বিদ্যা দিয়ে দেশের উপকার কমই করেছেন । দেশটাকে যুগ - যুগ ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে কতকগুলি নিষ্ঠাবান , আচারবান , ভক্তিমান , চরিত্রবান লােক , তাদের মধ্যে নিরক্ষর মেয়েছেলেদের সংখ্যা নগণ্য নয় । আজ আপনারা ফুটানি - টুটানি যা ’ করেন , তা তারা যা মা'পে দিছে তার উপর দাঁড়িয়ে । নইলে আর ফুটাতে হয় না । ইউরােপ , আমেরিকায় তাে ডাইভাের্স আছে , আগের স্বামীকে সামান্য কারণে ডাইভেসি ক'রে চ'লে এসে আবার বিয়ে করেছে , এমনতর মেয়েদের গর্ভে ক’টা মানুষের মতো মানুষ জন্মেছে , একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন যেন । আমি বাস্তব খবর জানি না , তবে এইটুকু বুঝি , ভাল হওয়ার একটা বিধি আছে ; সে - বিধি না মানলে ভাল হ'তে পারে না । দ্বিচারিণী স্ত্রী সুসন্তানের জননী হবে — এ আমি বিশ্বাস করি না । তাদের মধ্যে প্রতিভা কিছু - কিছু থাকতে পারে , কিন্তু তারা যে একনিষ্ঠ হবে না , আত্মনিয়ন্ত্রণ - ব্যাপারে শিথিল ও পরাঙ্মুখ হবে — এ নির্ঘাত কথা । কী চান আপনারা একটু ভাল ক'রে ভাবে দেখেন । আমরা যে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন করতে যেয়ে দেশের মূল ধারা , মূল সম্পদ , অনেকখানি বরবাদ করে ফেলছি , স্বরাজ পেয়ে তার নিরাকরণ করতে পারব , না এই স্রোতে গা ঢেলে দিতে বাধ্য হব , তাও ভাববার কথা । একবার সত্যেন শাস্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম , তুই বামুনের ছেলে , পৈতে পরিস না কেন ? সে বললাে , দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত পৈতে পরব না । আমি বললাম -- আর যার জোরে বাঁচবি , কাজ করবি , তাকেই যদি আগে খতম করিস , তাহলে কী দিয়ে কী করবি ? ও আমার কথা শুনে পরে পৈতে পরেছিল । তথাকথিত আন্দোলনগুলি বিদ্বেষ , অশ্রদ্ধা ও হীনম্মন্যতাকে যতখানি পুষ্ট করেছে , শ্রদ্ধাকে তার সিকি অংশও পােষণ দেয়নি । হাওয়া যদি এইরকম চলতে থাকে তাহলে সমাজে , শিক্ষাক্ষেত্রে , কর্মক্ষেত্রে , পরিবারে সর্বত্র বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে থাকবে । আমি মুখ্যু মানুষ , আমার কথা শােনেই বা কে ? কিন্তু দাসীর কথা বাসী হলি কামে লাগবি ।
শ্রীশ্রীঠাকুরের চোখমুখ ভাবের আবেগে জলজল করছে , কথাগুলি সবার প্রাণে এক অপূর্ব অগ্নিজ্বালা সৃষ্টি করছে । আস্তে - আস্তে লােকের ভিড় বেড়ে গেল । একটি মা খানিকটা পাটালি নিয়ে এসেছেন । শ্রীশ্রীঠাকুর বাড়ীর ভিতর দিতে ইঙ্গিত করলেন ।
আত্মহারা হয়ে বলে চলেছেন ঠাকুর -- ভারতকে রাশিয়া , আমেরিকা বা ইংল্যান্ড করে লাভ নেই । ভারত ভারত হােক , তবেই ভারতও বাঁচবে , জগৎও বাঁচবে । আদর্শপরায়ণতার অভাবে পাশ্চাত্ত্য অজ তার সব শক্তি ও সভ্যতা নিয়ে নিজের কবর নিজে খুড়ছে , তার ভারতও তাই করতে যাচ্ছে । এতে কোন লাভ নেই । পুরুষােত্তমের পতাকা নিয়ে ভারত আবার জগৎ - সভায় মাথা উচু করে একগাট্টা হয়ে দাঁড়াক - প্রেম , ভক্তি , জ্ঞানবীর্য্য - বিদ্যার পসরা মাথায় নিয়ে ; দুনিয়া এসে ভারতের কাছে তখন নতজানু ; হ'য়ে ভিক্ষা চাইবে --- তােমরা দাও আমাদের সেই অমৃত যা সর্ব্বার্থসাধক , যা’ অস্তর ও বাহির উভয় , লোকেই আমাদের সমভাবে সমৃদ্ধ ক'রে তুলবে । প্রবৃত্তি - দীর্ণ হ'য়ে অন্তরক্ষতের জ্বালায় আমরা ম'রে যাচ্ছি , আমাদের বাঁচাও ! ' ......... এ - পথে রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্যও হস্তমলকবৎ । দুনিয়ার প্রত্যেকটি দেশ তখন বাঁচার গরজে ইংরেজদের উপর চাপ দেবে - তােমরা ভারতের বুকের উপর জোর করে চেপে থাকতে পারবে না । তােমাদের বাঁচার জন্য যদি ভারতের সাহায্য প্রয়ােজন হয় , তা বরং তাদের বল , ভারত আকুণ্ঠিত চিত্তে সাধ্যমতাে তােমাদের সাহায্য করবে । কিন্তু যে জাত দুনিয়ার উদ্ধাতা , তাদিগকে শােষণ করতে পারবে না , প্রভুত্ব করতে পারবে না তাদের উপর ।
শ্রীশ্রীঠাকুর রবিদার ( বন্দ্যোপাধ্যায় ) দিকে চেয়ে বললেন আমার এ - সব কথা পাগলামী মতাে লাগে , তাই না ?
রবিদা - না ঠাকুর ! আপনার দয়ায় সবই সম্ভব ।
শ্রীশ্রীঠাকুর — হ্যাঁ ! পরমপিতার দয়ায় তোমাদের দিয়েই এটা সম্ভব , যদি তােমরা কর । ( আকুল কণ্ঠে ) —পরমপিতার দয়াকে নিস্ফল ক'রে দিও না বাছা ! রবিদা কেদে ফেললেন । সকলের চোখ ছলছল ক'রে উঠলাে । সাশ্রুনয়নে রবিদা বললেন — যেন পারি দয়াল ।
শ্রীশ্রীঠাকুর - এর মধ্যে ‘ যেন ' এনাে না । বল ‘ পারব ঠাকুর ! আমরাই পারব । সুখের কথা সাহস করে অন্ততঃ কওয়া শেখ । কও আর কর আর ভাব্ । দ্যাখ্ না কী হয় ! ✅
#আলোচনা_প্রসঙ্গে_তৃতীয়_খণ্ড
#তৃতীয়_সংস্করণ
https://www.amritokatha.in/
Telegram https://t.me/amritokatha
www.facebook.com/Amritokatha.in1



10